শাপলা-শালুকের আড়িয়াল বিলে

মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিল থেকে শাপলা ফুল সংগ্রহে ব্যস্ত কৃষক। ছবি: সাদ আব্দুল্লাহ

কাজী জেবুন নাহার
রাজধানী থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত অনন্য সুন্দর একটি ভ্রমণ গন্তব্য আড়িয়াল বিল। শীতে শস্য ভান্ডারে পরিণত হওয়া এ বিল বর্ষা ও শরতে থাকে জলে টইটম্বুর। এসময়ে বিলের প্রধান আকর্ষণ শাপলা ফুল। মহামারীর ঘরবন্দী এই সময়ে দিনে দিনে বেড়িয়ে আসতে পারেন শাপলা-শালুকের আড়িয়াল বিল থেকে।      

ঢাকার দক্ষিণে পদ্মা ও ধলেশ্বরী নদীর মাঝখানে অবস্থিত প্রায় ১৩৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ জলাভূমি দেশের মধ্যাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বিল। ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ এবং মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলা এর বি্স্তৃতি হলেও সিংহভাগই রয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলায়| শীতে এ বিল শুকিয়ে যায়, তখন এটা পরিণত হয় বিশাল শস্য ভাণ্ডারে। এ বিলে তখন চাষ হয় নানা রকম সবজি। তবে এখানকার মিষ্টি কুমড়া দেশ বিখ্যাত। এতো বড় মিষ্টি কুমড়া দেশের আর কোথাও চাষ হয়না।

আড়িয়াল বিল থেকে শাপলা তুলে শ্রীনগরের গাদিঘাটে নিয়ে এসেছেন কৃষকরা। ছবি: সাদ আব্দুল্লাহ

বর্ষা আর শরতে এ বিলে লিক লিক করে দেশি মাছ। আর বিলজুড়ে ফোটে আমাদের জাতীয় ফুল সাদা শাপলা ।কর্মহীন কৃষকদের অনেকেই এ সময়ে বিল থেকে শাপলা তুলে বিক্রি করেন। খুব সকালে কৃষকরা বিলে চলে যান শাপলা তুলতে। দিন শেষে ছোট ছোট নৌকা বোঝাই করে তারা ফেরেন শ্রীনগরের গাদিঘাট আর আলমপুর ঘাটে। সেখান থেকে পাইকরাররা এসে কিনে নিয়ে যান ঢাকার বাজারে।

আড়িয়াল বিলের গাদিঘাটে কৃষকদের শাপলা নিয়ে আসার দৃশ্য অতি মনোহর। দুপুরের পর থেকেই একটি-দুটি করে শাপলা বোঝাই নৌকা আসতে শুরু করে গাদিঘাটে। সেখানে বেশ কয়েকটি নৌকা জড়ো হয়ে বিলের পাড়ে স্তুপ করে রাখেন ফুল। সেখান থেকে ঢাকার বাজারে নিয়ে যান পাইকাররা। এসব ফুল পরে চলে যায় রান্নাঘরে, খাওয়া হয় সবজি হিসেবে।

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে আড়িয়াল বিলের বার্ডস আই ভিউ। ছবি: সাদ আব্দুল্লাহ

কীভাবে যাবেন
আড়িয়াল বিলের এ ভ্রমণে যাওয়ার জন্য নিজস্ব বাহন হলে ভাল। সে ব্যবস্থা না থাকলে তিন-চার জনে মিলে চাইলে ছোট কোন গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে যেতে পারেন। এছাড়া  ঢাকার গুলিস্তান ও সায়দাবাদ থেকে মাওয়াগামী যেকোনো বাসে চড়ে নামতে পারেন শ্রীনগরের ভেজবাজার। উত্তরা থেকেও প্রচেষ্টা পরিবহনের বাসে চড়ে ভেজবাজার নামা যায়। ভাড়া ৫০-৯০ টাকা। সেখান থেকে থেকে ব্যাটারি চালিত রিকশা কিংবা অটো রিকশা নিয়ে চলে যান গাদিঘাট। ভাড়া ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা।

কীভাবে বেড়াবেন
আড়িয়াল বিলে শাপলা তোলা দেখতে হলে যেতে হবে খুব ভোরে। কারণ সকাল ৯টার পর শাপলা ফুল আর ফুটন্ত থাকেনা। আর  ‍কৃষকদের নিয়ে আসা শাপলার স্তুপ দেখা যাবে বিকেলে। বিলে ঘোরার জন্য গাদিঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করতে হবে। দলে সদস্য সংখ্যা বিবচনা করে নৌকা ভাড়া করতে হবে। তবে করোনাভাইরাসের এই সময়ে এ ভ্রমণে বেশি মানুষ একসঙ্গে ভ্রমণে যাওয়া উচিৎ নয়। গাদি ঘাটে দুই থেকে ৫জন চড়ার উপযোগী হস্ত চালিত ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। পছন্দ মতো যে কোন একটি ভাড়া নিয়ে নিন। আকার ভেদে এখানে ১৫০-৩৫০ টাকা ঘন্টায় নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। তবে সারাদিনের জন্য ভাড়া নিলে দরদাম করে ভাড়া ঠিক করে নিতে পারেন।

আড়িয়াল বিলের গাদিঘাট থেকে ট্রাকে শাপলা তুলছেন পাইকার। ছবি: সাদ আব্দুল্লাহ

খাবার-দাবার
আড়িয়াল বিলের গাদিঘাটে ভাল খাবারের ব্যবস্থা নেই। সঙ্গে করে অবশ্যই পর্যাপ্ত খাবার ও পানি নিয়ে নিন।

মনে রাখবেন
করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে অবশ্যই মুখে মাস্ক পড়ে যাবেন। সঙ্গে রাখুন হ্যান্ড স্যানিটাইজার। যারা সাঁতার জানেন না, তারা সঙ্গে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট  নিন। আড়িয়াল বিলে ভ্রমণে গিয়ে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট এবং অন্য কোন রকম অপচনশীল বর্জ্য বিলে না ফেলে সঙ্গে করে নিয়ে আসুন।

পথে দেখবেন
আড়িয়াল বিলের গাদিঘাটের কিছুটা আগে সড়কের দক্ষিণ পাশে শ্যামসিদ্ধি গ্রামে আছে  ১৮৩৬ সালে নির্মিত ‘শ্যামসিদ্ধি মঠ’। যাওয়া কিংবা আসার পথে দেখে আসতে পারেন প্রাচীন এ মঠটিও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *