ভ্রমণ করের আদ্যোপান্ত

মুহাম্মদ হাসানুর রাসেল

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েই চলছে বাংলাদেশ থেকে বহিঃগামী পর্যটকের সংখ্যা। বিশেষ করে ভারত, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়শিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, মিশর, রাশিয়া প্রভৃতি দেশসমূহে প্রতি বছর বাংলাদেশী পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। আর এই ভ্রমণের সময় আমাদের দেশের ভ্রমণ কর আইন – ২০০৩ অনুযায়ী প্রত্যেক ভ্রমণকারীকেই নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ ‘ভ্রমণ কর’ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়। তাই জেনে রাখুন ভ্রমণ করের আদ্যোপান্ত।

ভ্রমণ কর কি?

আপনি যখন স্থল, জল অথবা আকাশপথে রাষ্ট্রীয় ভূ-সীমা অতিক্রম করে অন্য কোন রাষ্ট্রে গমন করবেন, তখন আপনার এই যাত্রাকে ভ্রমণ হিসেবে বিবেচনা করে আপনার থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কর হিসেবে আরোপিত হবে যা আপনাকে রাষ্ট্রীয় ভূ-সীমা অতিক্রম করার পূর্বেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পরিশোধ করে দিতে হবে। আর এই ভ্রমণ করার কারণে আরোপিত কর ‘ভ্রমণ কর’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে।

ভ্রমণ কর কে দিবে?

বাংলাদেশ ভ্রমণ কর আইন, ২০০৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে আকাশ, স্থল কিংবা জল পথে অন্য কোন দেশে যে কোন যাত্রীর গমনের ক্ষেত্রে সেই যাত্রীকে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ ভ্রমণ কর হিসেবে পরিশোধ করতে হবে।

সকল যাত্রীকেই কি ভ্রমণ কর দিতে হবে?

না, ভ্রমণ কর আইন অনুযায়ী নিম্নোক্ত শ্রেণির যাত্রীগণ ভ্রমণ কর হতে সম্পূর্ণ অব্যহতি পাবেন অর্থাৎ তাদের কোন প্রকার ভ্রমণ কর দিতে হবে নাঃ

  • পাঁচ বৎসর বা তাহার চেয়ে কম বয়সের কোন যাত্রী;
  • ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী;
  • অন্ধ ব্যক্তি;
  • ষ্ট্রেচার ব্যবহারকারী পঙ্গু ব্যক্তি;
  • বিমানে কর্তব্যরত ক্রু এর সদস্য;
  • বাংলাদেশে অবস্থিত কূটনীতিক মিশনের কূটনৈতিক মর্যাদাসম্পন্ন সদস্য ও তাহাদের পরিবারের সদস্যগণ;
  • জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও তাঁহাদের পরিবারের সদস্যগণ;
  • হজ্ব ও ওমরা পালনের জন্য সৌদি আরব গমনকারী ব্যক্তি;
  • বাংলাদেশের ভিসাবিহীন ট্রানজিট যাত্রী যাহারা বাহাত্তর ঘণ্টার বেশী সময় বাংলাদেশে অবস্থান করবেন না; এবং
  • যে কোন বিমান সংস্থায় কর্মরত বাংলাদেশী নাগরিক যিনি বিনা ভাড়ায় অথবা হ্রাসকৃত ভাড়ায় বিদেশ গমন করবেন।

    স্থল, জল এবং আকাশ পথে কি একই পরিমাণ ভ্রমণ কর প্রদান করতে হবে?

না, স্থল, জল এবং আকাশ পথের ভ্রমণ কর ভিন্ন, ভিন্ন। স্থল পথে প্রত্যেক ভ্রমণকারীকে ৫০০ (পাঁচশত) টাকা, জলপথে ৮০০ (আটশত) টাকা এবং আকাশ পথে বিভিন্ন রুটে বিভিন্ন হারে প্রতিবার ভ্রমণের জন্য প্রতি যাত্রীকে ভ্রমণ কর প্রদান করতে হবে।

আকাশপথের ভ্রমণ কর হার কত?

আকাশপথে ভ্রমণ কর এর সাথে এক্সাইজ ডিউটি বা আবগারী শুল্ক আরোপ হয়ে মোট প্রদেয় কর নিরূপণ হয় যা বিভিন্ন দেশ এবং রুটের জন্য বিভিন্ন। আকাশপথের ভ্রমণ কর হার নিম্নে দেয়া হলঃ

সার্কভুক্ত দেশের জন্য ভ্রমণ কর ১,২০০ টাকা এবং আবগারী শুল্ক ৫০০ টাকাসহ মোট ১,৭০০ টাকা।

সার্কব্যাতীত অন্য এশিয়ান দেশসমূহের জন্য ভ্রমণ কর ৩,০০০ টাকা এবং আবগারী শুল্ক ২,০০০ টাকাসহ মোট ৫,০০০ টাকা।

এশিয়ার বাইরে বিশ্বের অন্যান্য সকল দেশের জন্য ভ্রমণ কর ৪,০০০ টাকা এবং আবগারী শুল্ক ৩,০০০ টাকাসহ মোট ৭,০০০ টাকা।

ভ্রমণ কর কোথায় প্রদান করবেন?

আকাশ পথে ভ্রমণের সময় আপনার হয়ে আপনার এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ আপনার ভ্রমণ কর সংযুক্ত করেই টিকেট এর মূল্য নির্ধারন করে। ফলে আপনাকে আলাদা কোন ভ্রমণ কর দিতে হবে না। একইভাবে রেল এবং জলপথে ভ্রমণকারীদের ভ্রমণ করও টিকেট এর মূল্যের সাথে সংযুক্ত থাকে (ব্যতিক্রম হতে পারে)। ভ্রমণ কর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত রশিদে অথবা সোনালী ব্যাংকের নির্ধারিত কোডে ১/১১০৩/০০০০/০৯১১ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। স্থলপথে যাত্রা করা ভ্রমণকারীরা যাত্রার পূর্বেসোনালী ব্যাংক লিমিটেড এর নিম্নোক্ত শাখাসমূহ হতে জমা দিতে পারবেনঃ

  • স্থানীয় কার্যালয়, ঢাকা
  • ওয়েজ আর্নার্স কর্পোরেট শাখা, ঢাকা
  • দিলকুশা কর্পোরেট শাখা, ঢাকা
  • রমনা কর্পোরেট শাখা, ঢাকা
  • বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কর্পোরেট শাখা, ঢাকা
  • সদরঘাট কর্পোরেট শাখা, ঢাকা
  • বি-ওয়াপদা কর্পোরেট শাখা, ঢাকা
  • ঢাকা ক্যান্টঃ কর্পোরেট শাখা, ঢাকা
  • নিউমার্কেট শাখা, ঢাকা
  • কাওরান বাজার শাখা, ঢাকা
  • হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শাখা, ঢাকা
  • কে সি দাস রোড শাখা, চট্টগ্রাম
  • আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখা, চট্টগ্রাম
  • কাষ্টম হাউজ রোড শাখা, চট্টগ্রাম
  • শাহ আমানত বিমানবন্দর শাখা, চট্টগ্রাম
  • কক্সবাজার শাখা
  • রামগড় শাখা, রাঙ্গামাটি
  • রাজশাহী শাখা, রাজশাহী
  • গোদাগাড়ী শাখা, রাজশাহী
  • খুলনা শাখা, খুলনা
  • যশোর শাখা, যশোর
  • বেনাপোল শাখা, যশোর
  • কুষ্টিয়া শাখা, কুষ্টিয়া
  • দর্শনা শাখা, কুষ্টিয়া
  • সাতক্ষীরা শাখা, সাতক্ষীরা
  • সিলেট শাখা, সিলেট
  • কোর্ট বিল্ডিং শাখা, সিলেট
  • ষ্টেশন রোড শাখা, সিলেট
  • ওসমানী বিমানবন্দর শাখা, সিলেট
  • জৈন্তাপুর শাখা, সিলেট
  • জকিগঞ্জ শাখা, সিলেট
  • চারখাই শাখা, সিলেট
  • শমসেরনগর শাখা, মৌলভীবাজার।

ভ্রমণ কর কি বছরে একবার দিতে হয়?

না, প্রতিবার ভ্রমণের জন্য ভ্রমণ কর দিতে হয়। আপনি যদি একই বছরে একাধিকবার ভ্রমণ করেন, তবে প্রতিবার ভ্রমণের জন্য আপনাকে ভ্রমণ কর দিতে হবে। স্থল, জল, রেল এবং আকাশ যে পথেই যান না কেন, সেই পথের জন্য নির্ধারিত হারে আপনাকে ভ্রমণ কর দিতে হবে।

ভ্রমণ কর প্রদানের রশিদ কি সাথে রাখতে হবে?

হ্যাঁ, আপনার পরিশোধিত ভ্রমণ কর এর রশিদ ভ্রমণের সময় আপনার সঙ্গে রাখতে হবে। সরকারী কোন সংস্থা কোন কারনে তা দেখতে চাইলে তা প্রদর্শন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *