ভেসে ভেসে ভাসমান বাজারে

ছবি: মুস্তাফিজ মামুন

মুস্তাফিজ মামুন

বর্ষা মৌসুমে ভ্রমণের অন্যতম একটি গন্তব্য দক্ষিণের ব্যাকওয়াটার।  বরিশাল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠী-এই তিন জেলার ছোট ছোট খালগুলোর স্রোতের সঙ্গে বয়ে চলা এ অঞ্চলের  মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আর এখানকার ভাসমান বাজারগুলো এ ভ্রমণের মূল আকর্ষণ। এক দিনে ঘুরে বেড়ানো যায় তিন জেলার ছোট ছোট খালে আর উপভোগ করা যায় তিনটি অসাধারণ ভাসমান বাজার।

বরিশাল জেলার বানারিপাড়ায় সন্ধ্যা নদী থেকে ছোট ছোট অনেক খাল ঢুকেছে  সেখানকার গ্রামগুলোতে। এ খালগুলোকে কেন্দ্র করেই এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা বহমান। দৈনন্দিন কাজ কর্মের বেশিরভাগই এ খালগুলোকে কেন্দ্র করেই। কারো বাড়ির পেছনে, কারো বাড়ির সামনে থেকেই বয়ে চলেছে খালগুলো। সবার বাড়ির সামনেই ঘাট বানানো আছে এ খালে। বর্তমান সময়ে এ এলাকায় সড়ক পথের উন্নয়ন ঘটলেও অনেকের কাছেই এখনো যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে এসব জলপথই রয়ে গেছে। বাজার-সদাই থেকে শুরু করর আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাবারও প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম এই খালগুলোই।

ছবি: মুস্তাফিজ মামুন

বানারিপাড়া থেকে খালে খালে ঘুরে এক ঘন্টায় আসা যায় স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর বাজারে। পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার বর্তমান নাম নেছারাবাদ। এখানকার আটঘরে এ সময়ে প্রতিদিনই বসে ভাসমান বাজার। আটঘর বাজারের প্রধান পন্য পেয়ারা। এছাড়া স্থানীয় উৎপাদিত নানান সবজি, পান, সুপারিসহ নানান ফলমূল নৌকায় করে বিক্রি হয় এ বাজারে। আটঘর বাজারটি মূলত তিন খালের মোহনায়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এ বাজারের ব্যস্ততা বেশি থাকে।

আটঘর থেকে সামান্য সামনেই কুড়িয়ানা। এখানেও বর্ষা মৌসুমে বসে একটি নৌকার হাট। শুক্রবার এখানকার হাটের দিন। এ হাটের প্রধান পন্য নৌকা হলেও মাছ ধরার সরঞ্জামাদিও বিক্রি হয়। তবে এ হাটের ব্যস্ততা বাড়ে দুপুরের পরে। সকাল থেকে কুড়িয়ানা হাটে বড় বড় নৌকায় বোঝাই করে আসে ছোট নৌকা। এসব নৌকা এনে কুড়িয়ানার খালে ভাসিয়ে রাখা হয় বিক্রির জন্য। ভরা মৌসুমে খাল পরিপূর্ণ হয়ে আশপাশের সড়কও ভরে যায় নৌকায়।

ছবি: মুস্তাফিজ মামুন

কুড়িয়ানা থেকে বিভিন্ন খালে ঘুরে ঘুরে প্রায় দুই ঘন্টায় আসা যায় ভিমরুলির ভাসমান বাজারে। এ বাজারে যাবার পথেই দেখে নিতে পারেন পেয়ারার বাগান। এপথে খালের দুইপাশে শুধুই পেয়ারার বাগান। অনুমতি নিয়ে যে কোন বাগান দেখে নিতে পারেন। এখানকার পেয়ারার বাগানগুলোও অনেকটাই পানির ভেতরে। নিচু জমির ভেতরে নালা কেটে তার দুইপাশে লাগানো পেয়ারার গাছ।

ভিমরুলি ভাসমান বাজারটি ঝালকাঠী জেলার সদর উপজেলায়। জুলাই-অগাস্ট মাসে ভিমরুলি বাজারের ব্যস্ততা বেশি থাকে। এ সময়ে এ বাজারের প্রধান পন্য পেয়ারা।

কীভাবে যাবেন
ঢাকার সদরঘাট থেকে হুলারহাট বিংবা ভান্ডারিয়া গামী লঞ্চে চড়ে খুব ভোরে নামতে পারবেন বানারিপাড়া কিংবা স্বরূপকাঠী উপজেলা সদরে। এ পথে রাজদূত -৭, অগ্রদূত প্লাস লঞ্চসহ কয়েকটি লঞ্চ চলাচল করে। ঢাকা থেকে বানারিপাড়া লঞ্চের দ্বৈত কেবিনের ভাড়া ২০০০ টাকা, একক কেবিন ১০০০ টাকা, ডেকে জনপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা। এছাড়া ঢাকার সদরঘাট থেকে যে কোন লঞ্চে বরিশাল এসে সেখান থেকেও বাসে আসা যায় বানারিপাড়া ও স্বরূপকাঠী। বরিশালে নথুল্লাবাদ বাস স্টেশন থেকে প্রতি ত্রিশ মিনিট পর পর এ পথের বাসগুলো ছেড়ে যায়।

ছবি: মুস্তাফিজ মামুন

কীভাবে বেড়াবেন
বানারিপাড়া কিংবা স্বরূপকাঠী থেকে সারা দিনের জন্য ছোট ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করে ঘুরে বেড়াতে হবে এসব এলাকায়। সারা দিনের জন্য দশ জনের উপযোগী একটি নৌকার ভাড়া পড়বে ১২০০-২০০০ টাকা। বিকেলের মধ্যে ভ্রমণ শেষ করে আবারো ফিরতি লঞ্চ ধরতে পারেন স্বরূপকাঠী কিংবা বানারিপাড়া থেকে। এছাড়া বানারিপাড়া থেকে বাসে বরিশাল এসেও সেখান থেকে লঞ্চে ঢাকায় ফিরতে পারেন। তবে এ পথে আসলে ফিরতি পথে দেখে নিতে পারেন বরিশালের সবচেয়ে আর্ষণীয় মসজিদ গুঠিয়া এলাকার বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও দুর্গা সাগর দিঘি।

প্রয়োজনীয় তথ্য
ঢাকা থেকে রাতের লঞ্চে ভ্রমণ করে পরের দিন বেড়িয়ে আবার রাতের লঞ্চেই ফিরে আসা যায়। এ ভ্রমণের পুরোটাই জলপথে। যাদের সাঁতার জানা নেই তারা সঙ্গে তাই লাইফ জ্যাকেট নিতে ভুলবেন না। ভ্রমণে দুপুরের খাবারের জন্য ভাল যায়গা আটঘর বাজারের সন্ধ্যা রাণীর রেস্তোঁরা কিংবা ভিমরুলি বাজারে জনি রেস্তোঁরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *