ঘুরে আসুন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

জাদুঘরের নিচতলায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। ছবি: বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

কাজী জেবুন নাহার
বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী ছিল ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক এই বাড়িটি।

১৯৬১ থেকে ১৯৭৫ এর ১৪ আগস্ট- মাত্র এই ১৫টি বছর এ বাড়িতেই বসবাস করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭৫ এর ১৫ আগস্টের কাল রাতের নির্মম হত্যাযজ্ঞ সেই বাড়িটিকে রূপ দিয়েছে শোকের জাদুঘরে।

শোকের এই মাসে ঘুরে আসতে পারেন ঐতিহাসিক এ বাড়িটির অন্দর থেকে।

ইতিহাস
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর এই বাড়িটিতে বসবাস শুরু করেন।১৯৬২ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনসহ যুদ্ধের প্রথম উত্তাল দিনগুলো তিনি এ বাড়িতেই কাটিয়েছেন। সে সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও তিনি নিয়েছিলেন এ বাড়িতে বসেই। ঐতিহাসিক এ বাড়ি থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকে অসংখ্যবার গ্রেফতারও করে।

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে জাতির জনকের এই বাড়িটি এখন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর। ছবি: বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এ বাড়ি থেকেই রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম পরিচালনা করতেন বঙ্গবন্ধু। খুব অল্প সময় পরেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই বাড়িতেই সপরিবারে হত্যা করা হয় তাঁকে। কেবল বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর বড় বোন শেখ রেহানা সে সময়ে বিদেশে থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যান।

জাদুঘরে রূপান্তর
দেশে ফেরার পর ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে বাড়িটি হস্তান্তর করা হয়। বাড়িটি বুঝে নেওয়ার পর দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ঘোষণা করেছিলেন ঐতিহাসিক এই বাড়িটি হবে জনগণের। পরে ১৯৯৩ সালে বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের জন্য বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করেন তাঁরা। পরে ট্রাস্ট বাড়িটিকে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরিত করে। ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট জাদুঘরটির দুয়ার জনসাধারণের জন্য খুলে করে দেয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি
ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের গাছগাছালি ঘেরা সাদা রঙের তিনতলা মূল ভবন এবং এর পাশের আরেকটি ভবন নিয়েই গড়ে তোলা হয়েছে জাদুঘর। বাড়িটির দেয়ালের সামনে  এবং বিপরীত পাশে ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর দুটি প্রতিকৃতি। ভবনটির নিচ তলায়ও একটি সুন্দর প্রতিকৃতি আছে।

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। ছবি: বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

নিচ তলা
জাদুঘরের নিচ তলায় রয়েছে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্টে নিহতদের ছবি আর সে সময়কার ব্যবহৃত কিছু আসবাবপত্র। এটি আগে ছিল বসার ঘর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ ঘরেই বঙ্গবন্ধু দেশ-বিদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে বৈঠক করতেন।

পাশের ঘরটি ছিল বঙ্গবন্ধুর পড়ার ঘর। ১৯৭১ সালে এই ঘর থেকেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার নির্মম চিহ্ণ
নিচ তলা থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে চোখে পড়বে বিভীষিকাময় সেই রাতের ক্ষতচিহ্ণ। বঙ্গবন্ধুর শরীর ক্ষতবিক্ষত করে সেদিন ভবনের দেয়ালের গায়েও লেগেছিল গুলি। সেই ভয়াবহ ক্ষত এখনো বহন করে চলছে ভবনটির দেয়াল। এই সিঁড়ি আজও বহন করে চলছে বঙ্গবন্ধুর সেই রক্ত। সিঁড়িটি তাই চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

৭৫ এর ১৫ আগস্ট রাতে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির এই সিঁড়িতেই ঘাতকের বুলেটে নিহত হয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

দ্বিতীয় তলা
ভবনটির দোতলায় বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষ। ১৫ আগস্ট ভোরে বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ কামাল, শেখ রাসেল এবং বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধূর রক্তাক্ত মৃতদেহ এখানেই পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুর শোবারঘরে বিছানার পাশেই ছোট টেবিলে সাজানো আছে তার হাতে থাকা পাইপ আর তামাকের কৌটা। এ কক্ষে অন্যান্য আসবাবের মধ্যে আরও আছে টেলিফোন সেট ও রেডিও আর কিছু রক্তমাখা পোশাক।

বঙ্গবন্ধুর শয়নক্ষ। ছবি: বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

সামনের খাবার ঘরের পাশেই আছে শিশু রাসেলের ব্যবহার করা বাইসাইকেলটি। উল্টো দিকে শেখ জামালের কক্ষে আছে তার সামরিক পোশাক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার কক্ষও এই তলাতেই।

তৃতীয় তলা
বাড়িটির তৃতীয় তলায় বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের কক্ষ। এ কক্ষে তার বিভিন্ন সংগীতযন্ত্র সাজিয়ে রাখা আছে।

বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের কক্ষ। ছবি: বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

আরো যা যা আছে
ভবনের মোট নয়টি কক্ষে বিভিন্ন সামগ্রীর মধ্যে আরও আছে বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধূ সুলতানা কামালের বৌ-ভাতের সবুজ বেনারসি শাড়ি, রোজী জামালের লাল ঢাকাই জামদানি, বিয়ের জুতা, ভাঙা কাচের চুড়ি, চুলের কাঁটা, শিশুপুত্র রাসেলের রক্তমাখা জামা, বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা সাদা পাঞ্জাবি, তোয়ালে, লুঙ্গি, ডায়েরি ইত্যাদি।

এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যবহার্য আসবাবের মধ্যে আরও আছে খাবার টেবিল, টেবিলের ওপর থালা, বাটি। আছে রেকসিনের সোফা। খাওয়ার পর এ সোফায়  বিশ্রাম নিতেন বঙ্গবন্ধু। এই ঘরের দেয়ালেও রয়েছে গুলির চিহ্ন। এখানে পিয়ানো, সেতার ইত্যাদি আগের মতো করেই সাজানো আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞ আর লুটপাটে এ বাড়ির অনেক মূল্যবান জিনিসপত্রই খোয়া গেছে। এর পরেও যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সেসব দিয়ে অনেকটা আগের আবহেই সাজানো হয়েছে এর অন্দরমহল।

বঙ্গবন্ধুর মেঝ ছেলে শেখ জামালের কক্ষ। ছবি: বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সায়েরা খাতুন গ্যালারি
বাড়ির পেছনেই জাদুঘরের সম্প্রসারিত নতুন ভবন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাবা-মার নামেই ‘শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সায়েরা খাতুন গ্যালারি’ এর নামকরণ। ২০১১ সালের ২০ আগস্ট এ অংশটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয়। ছয় তলা ভবনের দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র রয়েছে। পঞ্চম তলায় আছে পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র।

স্মারক বিক্রয় কেন্দ্র
বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে সড়কের বিপরীত পাশে আছে একটি স্মারক বিক্রয় কেন্দ্র বা স্যুভেনির শপ। এখানে পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই, টি-শার্ট, মগ ইত্যাদি বিভিন্ন রকম স্মারক সামগ্রী।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সম্মুখভাগ। ছবি: বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

প্রয়োজনীয় তথ্য
ঢাকার শুক্রাবাদ বাস স্টেশনের পাশেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক।আর সেখানেই অবস্থিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর। সাপ্তাহিক ছুটি বুধবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘরটি।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ৫ টাকা। তবে ৩ বছরের নিচের বাচ্চাদের প্রবেশে কোন মূল্য লাগে না। এছাড়া ১২ বছরের কম বয়সীদের জন্য শুক্রবারে বিনামূল্যে জাদুঘর ঘুরে দেখার ব্যবস্থা আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *