নদী. . . .নাম তোমার চেঙ্গি

নীল আকাশটা থেমে থেমে কেঁপে উঠেছিল। ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন

হোমায়েদ ইসহাক মুন

ছোট্ট গ্রামটির নাম খবংপড়িয়া। খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে মাত্র কিলোখানেক দূরে। গ্রামটা বেশ ছিমছাম আর নিরিবিলি। প্রধান রাস্তা থেকে গ্রামের সংযোগস্থল হয়ে সরু একটা পথ চলে গেছে। দুপাশ জুড়ে ছায়াবিথীর পথ ধরে মিনিট খানেক হেটে গেলে সুন্দর একটা নদী নজরে আসবে। নদী- নাম কি তোমার! তুমি যে বড় সুন্দর! নাম আমার চেঙ্গি।

চেঙ্গি নদীকে চাকমা ভাষায় বলে ‘চেঙ্গে’ আর মারমা ভাষায় ‘চৈঙ্গি’। যে নামেই ডাকা হোক না কেন এই নদীর বহমান স্রোত আর সরলতা সবাইকে কাছে টানে। এই নদীকে নিয়ে প্রচলিত একটা কাহিনী আছে – এক গ্রামে শ্যাম বর্ণের একটি মেয়ে থাকতো। সে খোলা আকাশের নিচে, বিস্তীর্ণ সবুজের মাঝে বসে শুধু ভাবতো। যদি ঐ দূর পাহাড়ের গা ঘেষে থাকা নদীটাতে ঘুরে বেড়ানো যেত মনের মানুষের সঙ্গে! গ্রামের মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা চুপি চুপি দেখা করতো, নদীর পাড় ধরেও হাটতো। সেই মেয়েটির নাম ছিল চেঙ্গি।

ত্রিপুরা রাজ্যের মেয়ে চেঙ্গি ভালবেসে ফেলেছিল অন্য জাতিগোষ্ঠীর একজনকে। এই মন দেওয়া-নেওয়া কে ভাল চোখে দেখেনি তার পরিবার এবং সমাজ। চেঙ্গিকে তারা আটকাতে চেয়েছিল। কিন্তু ভালবাসাকে সে পরাস্ত হতে দেয়নি। ঝাঁপ দিয়েছিল এই নদীতে। ভালবাসার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করলো। এর থেকেই নদীটার নাম হয়ে যায় চেঙ্গি।

নীরবতার সময়ে চেঙ্গি নদী। ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন

পুরাণে অনেক গল্পই থাকে, তাতে কি! যে নদীর এত রুপ তাকে নিয়েতো কল্প-কহিনী থাকারই কথা। চেঙ্গি তার সৌন্দর্য্য এখনো ধরে রেখেছে। দেশের পার্বত্য অঞ্চল খাগড়াছড়ির প্রধান নদী এটি। আকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে চেঙ্গি নদী তার গতিপথ তৈরি করেছে বহু যুগান্তর ধরে। মানুষের মনের পরিবর্তন ঘটে, নদীকে শোষন করার লোভ জাগে। তারপরও নদী তার নিজের গতিতে চলে। মাঝে মাঝে গর্জে উঠে, আবার সে পরাজিত হয়।

‘ভিএসও’ স্বেচ্চাসেবক দলের একজন হয়ে খবংপড়িয়া গ্রামে কিছুদিন থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কিছুটা সহযোগিতা করার জন্য কাজ করেছিলাম। নদীর পাড় ঘেষা সবুজ শ্যামল এ গ্রাম বড় স্থির, চুপচাপ! চাকমা জনগোষ্ঠীর বসবাস এ গ্রামে। তারা নির্ঝঞ্জাট, পরিপাটি। হাসিমাখা সরল মানুষ। অল্পদিনেই এই গ্রামের মানুষদের সঙ্গে আত্মার আত্মীয় হওয়া যায়।

গ্রামের প্রবশ মুখে আছে ইয়ং স্টার ক্লাব। সেখানে বসে আমরা দিনের আলোচনাগুলো সেরে নিতাম। গ্রামের সামাজিক উদ্যোগ এবং পরামর্শে ক্লাবের সদস্যরা সর্বদা এগিয়ে আসে। পাশেই আছে একটি মাঝারি আকারের বটগাছ। সেখানে নানা জাতের পাখি বসে আর বৃহস্পতিবার হাটবারে বসে আশপাশের ক্ষেত থেকে তুলে আনা টাটকা শাক-সবজি। জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই নিরামিষভোজি। পাশে আছে সুজনদা আর মিলনদার চায়ের দোকান। গ্রামের লোকজন চলতি পথে একটু জিরিয়ে নেয়।

আমরাও কাজ শেষে আড্ডা জমাতাম। অল্প দূরে স্বনির্ভর বাজার। নামের সাথে কাজেরও মিল আছে, বাজারটায় মোটামুটি প্রয়োজনীয় সব কিছুই পাওয়া যায়, এক কথায় স্বনির্ভর। হাটবারে লোক-সমাগম ভাল হয়। এ অঞ্চলে কলা বেশ সুস্বাদু। পাহাড়ি কলার কাদি বাঁশের দু‘প্রান্তে বেঁধে কাধে করে চাষীরা ছুটে আসে হাটে।

পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা চেঙ্গি নদী। ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন

যে বাড়িটাতে আমি থাকতাম তা কাঠ দিয়ে তৈরি, গরমে বেশ আরাম লাগে। বাবুলদার সুন্দর সুখী পরিবারের সদস্য হয়েছিলাম মাস কয়েকের জন্য। বাড়িতে নানা পদের ফুল-ফলের গাছ শোভা বর্ধন করেছে। আসলে প্রতিটি বাড়িই এমন সুন্দর বাগানে সাজানো গোছানো। এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে সৌন্দর্যবোধটা আছে তা তাদের ঘরদোর আর বাগান দেখেই অনুমান করা যায়। সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে সবসময় যে দারিদ্র কিংবা প্রাচুর্যের সম্পর্ক আছে, তা কিন্তু বলা যায় না। খুব সাধারণ বেড়ার ঘরও যদি পরিষ্কার আর পরিপাটি রাখা যায় তাতে করে বাড়িতে যারা থাকে তাদেরও যেমন শান্তিবোধ হয় তেমনি লোকের চক্ষুপীড়ার কারণও ঘটে না।

ঘরের পশ্চিম দিকের জানলা খুললে নদী আর পাহাড় দেখা যায়। খবংপড়িয়া গ্রাম থেকে নদী পার হয়ে যাবার জন্য একটি সাঁকো দেওয়া আছে। অন্য পাড়ে কিছু দূর সবজির ক্ষেত পার হয়ে হেঁটে গেলে ছোট্ট একটা টিলা পড়বে। সেখানে দু’এক ঘর পেছনে ফেলে মেঠো পথ ধরে এগিয়ে গেলে পাহাড়ি ঝিরির সরূ ধারা। তা ডিঙ্গিয়ে একটু বাঁকা পথে হেটে গেলেই একটা ছোট পাহাড়, নাম বড়শিল। চাকমা ভাষায় বলে ‘শিলতুক’।

পাহাড়ের চূড়ায় বেশ বড় বড় কিছু পাথর খন্ড আছে, তার থেকেই হয়ত এর নাম হয়েছে বড়শিল বা শিলতুক। পাহাড়টা হাজার খানেক ফুট হবে, তাতে মাটি কেটে সিড়ির মত ধাপ করে দেওয়া আছে। সিড়ির দু’পাশ জুড়ে সারি সারি গাছগুলো ছায়া দিয়ে রেখেছে পথটাকে। একদম উপরে উঠে একটা লম্বা দম নিয়ে আস্তে আস্তে ছাড়তে হবে। তাহলে শান্তি অনুভুত হয়। সেখানে রয়েছে ছোট্ট খিয়াং ঘর বা বৌদ্ধমন্দির। আর্জধাম বৌদ্ধ বিহার এর কথা বললে সবাই চিনিয়ে দিবে। গেরূয়া পোশাক পরা বৌদ্বভিক্ষুরা সেখানে ধ্যান করেন। পাহাড়ের চূড়াতে তাদের থাকবার জন্য জায়গা করে দেওয়া আছে। নিচের গ্রাম থেকে ভিক্ষুদের জন্য খাবার পৌছে দেয়া হয় নিয়মকরে দিনে একবার।

আর্জধাম বৌদ্ধ বিহার এর খিয়াং ঘর। ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন

ধর্মগুরূদের অন্নপ্রসানে গ্রামের মানুষের মঙ্গল হয়। পাহাড়ের চূড়া থেকে খাগড়াছড়ি শহর পেরিয়ে আরো খানিকটা দূরের পথ দেখা যায়। সাপের মত পেঁচিয়ে থাকা চেঙ্গি নদীটা অনেক দূরে মিলিয়ে গেছে। আকাশটা কখনো গর্জে উঠে, মৃদুমন্দ হাওয়া বয় আর ধোয়াশা হয় দূরের দৃশ্যগুলো। চূড়ার জায়গাটা ধ্যান করার জন্য সর্বত্তম স্থান। চারিপাশ সবুজ বনে ঘেরা আর পিনপতন নিরবতা। বনের নির্জনতা শোনার মত ভালো কাজ মনে হয় আর নেই।

এখানের প্রকৃতিই সবচেয়ে সুন্দর। পাখিরা মুক্ত-স্বাধীন, তারা বাসা বাধে নির্ভয়ে। ফুলেরা নীরবে কথা সেরে নেয় বনের ও জুমের নীরবতাকে মান্য করে। পাহাড়গুলোতে জুম চাষ হয় নিত্য-নৈমিত্তিক। মাঝে মাঝে যখন শুকনো জুমের ক্ষেতে আগুন ধরে যায়, এর লেলিহান শিখা দূর-দূরান্ত থেকে দেখা যায়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে মনে হয় ঐ দূর পাহাড়ে কেউ মশাল জ্বালিয়ে ডাকছে। এখানে খুব ভোরে মানুষেরা জেগে উঠে। প্রভাতের আলোকছটা সবুজ পাতার উপরে পরে থাকা শিশির বিন্দুতে তা প্রতিফলিত হয়। পাখিরা নীড় ছেড়ে বের হয় আর গ্রামের মানুষেরা কাজের সন্ধানে। নদীর তীর ঘেষে মেঠো পথ ধরে হেটে যেতে যেতে কতবার ভেবেছি, এই গ্রামেই যদি থেকে যাওয়া যেত!

এই গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যেন অপ্সরী । ওদের হাসি দেখলে যে কারো মন ভাল হয়ে যাবে। এত মায়া তাদের নিষ্পাপ চাহনি আর হাসিতে! আমরা যখন গ্রামের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেটে যেতাম কখনো কখনো তারাও আমাদের সাথে চলত। নদীতে পা ভেজানো, সাঁকো পার হওয়া, পাহাড়ের চূড়ার মন্দিরে যাওয়া সবখানেই ওরা আমাদের পথ দেখাতো। চেঙ্গি নদী তার রূপ বদলায় প্রতি মৌসুমে। শীতে সে কোমল মমতাময়ী আর বর্ষায় সে ফুলে ফেপে উঠে যেন সব গ্রাস করবে।

বড়শিল পাহাড়ে যাবার পথ। ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন

এ গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। তারা ধান ফলায়, আখ ফলায়, ভূট্টা আর সবজির আবাদ করে। সরিষা আর তুলা চাষও করে। কত পদের সবুজ সবজি নদীর পাড় ঘেষে! কি সুন্দর তার রং-রূপ-গন্ধ! আর এসবেই তো আমরা রাসায়নিক ছিটিয়ে এর গুনগুলোকে নষ্ট করে দেই। আবাদি জমিতে ফসল না ফলিয়ে বসতি গড়ে তুলি। গ্রামেও এখন শহুরে ইট পাথরের বাড়ি তৈরি হচ্ছে। এই গ্রামে মহিলারা কোমড় তাঁতে বেশ পারদর্শি। তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী পিনোন-খাদি নিজেরাই বানাতে পারে। এখন ছেলে-মেয়েরা শহরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে, শহুরে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে, তাই এসব কাজেরও দিনে দিনে কদর কমছে।

চেঙ্গি নদীতে যখন পানি কম থাকে তখন হেটে হেটে অনেকদূর পর্যন্ত চলে যাওয়া যায়। সেযাত্রায় ভ্রমণ পাগল কিছু মনুষের সাথে সখ্যতা হয়েছিল। উহ্লা প্রু দা, সাথোয়াই, অনুপম আমাকে কত বিচিত্র আর সুন্দর জায়গাগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। নানা জাতের সব পাখির সমাহার এই অঞ্চল জুড়ে। উহ্লা দা আমাকে অনেক গুলো নতুন জাতের পাখি দেখালো। কি তার সুন্দর বাহারি রং! এদের মধ্যে ছিল – আলতাপরি, ছোট কসাই, ছোট বসন্ত বৌরি, লাটরা, সবুজ বাঁশপাতি, সাদা খঞ্জন আরো কত নাম।

উহ্লা দা কে তার বন্ধুরা নাম দিয়েছে পাখি ভাই। বন-জঙ্গল ঘুরে ঘুরে পাখি দেখে মানুষটা। একবার নদী ধরে হাটতে হাটতে আমরা শহর ছেড়ে ‘মাইচ্ছরি’ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম। গামারিতলায় এসে থেমে যেতে হয়েছিল বাঁশপাতিদের দেখে। নদী থেকে মাথাটা উঁচু করে দেখলে নজরে আসবে মাটির টিলাতে বড় ছোট নানা গর্ত। কেউ খাবার মুখে করে ঢুকছে আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। আকারে তেমন বড় নয়, গায়ের রং কালচে। বেশ ছটফটে এই পাখি। এর সঙ্গে পার হতে হয়েছে গ্রামের বাঁকা পথ, ধানক্ষেতের আইল, বিশাল বটবৃক্ষ, পাখিদের কলকাকলি আর সবুজের সমারোহ।

তারেং থেকে পাখির চোখে খাগড়াছড়িকে দেখা যায়। ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন

একবার সবাই মিলে গেলাম আলুটিলা আর্মি হ্যালিপ্যাডে। উঁচু এই জায়গাটি থেকে পুরো খাগড়াছড়িকে দেখা যায়। পর্যটকদের জন্য সুন্দর করে বাধাই করে দেওয়া আছে জায়গাটা। নাম দেওয়া হয়েছে ‘তারেং’। মাথায় কি পাগলামি হলো, সাথোয়াই হঠাৎ করে বলল এখান থেকেই নিচে নেমে যাব। এবার সেই তারেং থেকেই খাড়া নামতে শুরু করলাম। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় পেয়ে বসলো। ঠাকুরছড়াতে বিশাল এক বটবৃক্ষের দেখা পেলাম। কিছুক্ষণ সেথায় হেলিয়া দুলিয়া প্রস্থান নিলাম। এরপর আবার কিছু পথ নেমে গিয়ে দক্ষিণ গোলাবাড়িতে গিয়ে নামলাম এবং শেষমেষ সেই মায়াবী চেঙ্গিতে পা ডুবালাম। এ বার নদী পার হয়ে বটতলী। আকাশে মেঘ জমেছিল আর সেদিনের মত বন্ধুর পথের সমাপ্তি হয়েছিল। ঘরে ফিরেছিলাম অপার আনন্দ নিয়ে।

পাহাড় থেকে নামার পথে বটবৃক্ষের ছায়াতলে। ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন

রাতের খবংপড়িয়া গ্রাম কথা কয় না। আকাশে চাঁদ আর মেঘের দল লড়াই করে। সেবার অনেক্ষণ অবদি বসে ছিলাম নদীর পাড়ে। হিম শীতল বাতাসের সঙ্গে ঝড়ো আবহাওয়া। হেলে দুলে নারকেল সুপারি গাছগুলো জানান দিচ্ছিল, বাড়ি যাও -ঝড় এল, এল ঝড়। মেঘেরা গর্জে উঠলো আর আকাশ অজোর ধারায় কেঁদে চলল। সেদিনের সেই মায়াবী আকাশটা আমার চিরকাল মনে থাকবে। নীল আকাশটা থেমে থেমে যেন কেঁপে উঠছিল। সেই ঝলকায় নদীটা আর ওপারের পাহাড়টাকে অদ্ভুত সুন্দর আর মায়াবী লাগছিল। এমন দৃশ্য দেখতে এই গ্রামে বার বার আসতে ইচ্ছে করে। শহরের কোলাহল ছেড়ে এমন একটা স্বপ্নের গ্রামে থাকার স্বাদ পূর্ণ হলো বলে বিধাতাকে হাজার বার কুর্নিশ করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *