দিনে দিনে চার জমিদার বাড়ি

পাকুল্লা জমিদার বাড়ি। ছবি: আর কে এফ মুন্না

আর কে এফ মুন্না

স্থাপত্য কিংবা ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণ যাদের পছন্দ তাদের জন্য উত্তম জায়গা হলো টাঙ্গাইল। পাকুল্লা জমিদার বাড়ি, দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি, করটিয়া জমিদার বাড়ি, মহেড়া জমিদার বাড়িসহ আরো অনেক প্রাচীন স্থাপনা আছে টাঙ্গাইলে। চারটি জমিদার বাড়িসহ আতিয়া মসজিদও দেখার ইচ্ছা। ভাবছিলাম এতোগুলা স্থাপনা ঢাকা থেকে দিনে দিনে বেড়িয়ে আসা আদৌ কি সম্ভব?

মন থেকে চাইলেই অনেক সময় অসম্ভবও আল্লাহর রহমতে সম্ভব হয়ে উঠে। ভ্রমণটির পরিকল্পনা যখন করি তখন প্রথমেই মাথায় শুধুই ঘুরপাক খাচ্ছিল কালিয়াকৈরের চিরচেনা সেই ট্রাফিক জ্যামের কথা।

যাই হোক ভেবে-চিন্তে আট জনের গ্রুপ একটা বড় মাইক্রোবাস ভাড়া করলাম। সারাদিনের জন্য ভাড়া ৬০০০ টাকা দিয়ে। এই ভ্রমণে আমরা পাবলিক পাবলিক বাস বাদ গিয়ে গাড়ি ভাড়া করলাম একদিনে অনেকগুলো জায়গা বেড়ানোর জন্য।

সকাল ৭টায় মিরপুর ১২ থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হবে। আগেভাগেই গাড়ি এসে হাজির। সময়মতোই আমরাও সবাই উপস্থিত। গাড়ি ছাড়ল ঠিক সময়েই। মিরপুর বেড়িবাঁধে সকালের মাতাল হাওয়া গায়ে মেখে আশুলিয়া হয়ে আমরা ছুটলাম টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে।

আমাদের প্রথম গন্তব্য পাকুল্লা জমিদার বাড়ি। মাঝপথে বিকেএসপির সোমনে গাড়ি থামিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। ঘন্টা দেড়েক এর মধ্যেই মির্জাপুর পার হয়ে আমরা পৌছে গেলাম পাকুল্লা।ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে ঐতিহাসিক পাকুল্লা জমিদার বাড়ি।দলের সবাইকে ৪০ মিনিট সময় বেঁধে দিলাম বাড়িটি ঘুরে দেখার জন্য।
পাকুল্লা জমিদার বাড়িটি কেমন যেন একটু ভূতুরে টাইপের মনে হলো। কিন্তু ভুটটুতে অবিশ্বাসী আমি এসব গায়ে মাখলাম না। বাড়ির প্রতিটি কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কত সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক স্থাপনা, অথচ সেদিকে আমরা বেখেয়াল।

সময় কখন শেষ হলো টেরই পেলাম না। আমাদের পরের গন্তব্য দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি। মহাসড়ক ছেড়ে এবার আমরা ছুটলাম গাঁয়ের পথ ধরে। আধা ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। এই জমিদার বাড়িটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত নয়। সে কারণে আগে থেকেই আমরা অনুমতি নিয়ে রেখেছিলাম।

দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি। ছবি: আর কে এফ মুন্না

বিশাল জায়গাজুড়ে দেলদুয়ার জামিদার বাড়ি। দু’জন তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া আর কেউ থাকেন না বাড়িটিতে। সদর দরজায় গিয়ে তাদের পরিচয় দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। মুগ্ধ হওয়ার মতো স্থাপনা! বাড়িটির সামনের উঠোনের সবুজ ঘাসে ভরা। দেখে সবুজ গালিচা ভেবে আমার মতো ভুল করতে পারেন যে কেউ। এরকম সবুজ ঘাসে হাঁটিনা কতদিন।

প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে দুজন কেয়ারটেকার আমাদের ঘুরিয়ে দেখালেন দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি। দেলদুয়ার জমিদার বাড়িটি অনেকের কাছে নর্থ হাউজ নামেও পরিচিত। বাড়িটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়না। জানা যায় বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ফতেহদাদ খান গজনবী লোহানি। জমিদার বংশধররা তাদের পূর্ব পুরুষ আফগানিস্তানের গজনী থেকে আসার কারণে তাদের নামের শেষে গজনবী লোহানি খেতাবটি ব্যবহার করতেন। জমিদার বাড়ির জমিদারদের মধ্যে দুজন ছিলেন খুবই আলোচিত সনামধন্য জমিদার। যারা ছিলেন দানবীর, উচ্চশিক্ষিত ও ব্যবসায়ী। তারা হলেন স্যার আবদুল করিম গজনবী এবং স্যার আবদুল হালিম গজনবী। আব্দুল হাকিম খান গজনবী ও করিমুন নেসা খানম চৌধুরানীর সন্তান ছিলেন তারা দুইজন। তাদের মাতা করিমুন নেসা ছিলেন বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত ও কবি বেগম রোকেয়ার বোন। সে সময় তাঁরা ছিলেন এ অঞ্চলের সবচেয়ে উচ্চ শিক্ষিত পরিবার।

দেলদুয়ার জমিদারবাড়ি দর্শন শেষ। এবার আমরা ছুটলাম আতিয়া মসজিদের উদ্দেশ্যে। গ্রামের আঁকাবাঁকা সেড়ক ধরে ছুটলাম আমরা। সড়কের দুইপাশে ছবির মতো সাজানো ফসলের ক্ষেত। কৃষি নির্ভর গ্রামবাংলার অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌছুলাম আতিয়া মসজিদের সামনে।
ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত পোড়ামাটির সুন্দর কারুকার্য মণ্ডিত স্থাপত্য নিদর্শন আতিয়া মসজিদ। দশ টাকার নোটে অসংখ্যবার দেখা সেই আতিয়া মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এন্যরকম এক অনুভূতি ছুঁয়ে গেল আমাকে। চারপাশটা ঘুরে দেখলাম ভালভাবে।

অতিয়া মসজিদ। ছবি: আর কে এফ মুন্না

আতিয়া মসজিদ দেখা শেষ। আবার গাড়ির চাকা ঘুরতে শুরু করল। এবার যাচ্ছি করটিয়া জমিদার বাড়ি। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই চলে আসলাম জায়গাটিতে। বাড়িটিতে ঢুকতে গিয়ে প্রথমে বাঁধার মুখে পড়লাম। কেয়ারটেকার জানালেন সাময়িক বাড়িটিতে প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু কারণ বলতে নারাজ তিনি। কিন্তু তার আচরণে বুঝলাম কিছু টাকা ছাড়লেই তার নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে।

বাস্তবেও তাই হল। মাত্র ২০০ টাকার বিনিময়ে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেন কেয়ার টেকার সাহেব। ঘুরে দেখলাম বাড়িটি। ভাগ্যিস দেখতে পারলাম। এতদূর এসে ফিরে গেলে মনে সবারই কষ্ট থেকে যেত।

করটিয়া জমিদার বাড়ি। ছবি: আর কে এফ মুন্না

একটু তড়িঘড়ি করেই দেখলাম করটিয়া জমিদারবাড়ি। বাড়িটিতে এখনো জমিদারদের পরবর্তী প্রজন্মের বসবাস আছে। মূল বাড়িটির পিছনে রোকেয়া মহল নামে একটি ভবন আছে যা এখন স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাড়ির ভিতরে রয়েছে নানা ফলের গাছ। তবে অনুমতি ছাড়া এসব ফলে হাত দেয়া ঠিক নয় ভেবে লোভকে সামলে নিলাম। বাড়ির সামনের প্রাচীন মসজিদটি দেখতেও ভুল করলাম না।

এরপরে দ্রুত আমরা ছুটলাম মহেড়া জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। সবাই ক্ষুধার্ত। করটিয়া বাজারে এসে ভাবলাম সামনের কোথাও খাবার খেয়ে নিবো। ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কে উঠে মহেড়া দিকে এগুচ্ছি আমরা। সবার চোখ মহাসড়রে দুই পাশে। কিন্তু ছোট ছোট কিছু চায়ের টং দোকান ছাড়া কোন রেস্তোঁরা চোখে পড়লনা।এদিকে ঘড়ির কাঁটা ৩টা পেরিয়ে গেছে। একজনের কাছে খাবারের সন্ধ্যান চাইলাম। তিনি জানালেন মহেড়া জমিদার বাড়িতেই খাবার পাওয়া যাবে। মনে হলে করটিয়া থেকেই দুপুরের খায়ও শেষ করে আসা উচিৎ ছিল। সাড়ে তিনটা নাগাদ মহেড়া জমিদার বাড়ি পৌঁছুলাম। সেখানকার রেস্তোঁরায় গিয়ে দেখলাম খাবার যা আছে তার সবই চাইনিজ। দেশি কোন খাবার নেই। বিভিন্ন দামের সেট মেন্যু। সেখান থেকে দ্রুত ঢুকে পড়লাম জমিদার বাড়ি দেখতে।

মহেড়া জমিদার বাড়ি। ছবি: আর কে এফ মুন্না

১৯৭২ সাল থেকে এ সুরম্য এ বাড়িতে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার থাকায় পুরো জমিদারবাড়ি খুবই ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত আছে। জমিদার বাড়ির সামনে বিশাল একটি দিঘি, নাম তার বিশাখা সাগর। এর ভেতরে পাশাপাশি তিনটি সুরম্য প্রাসাদ। ভেতরে আছে আরও কয়েকটি ভবন, মন্দির ইত্যাদি। সর্ব ডানের প্রাসাদটির নাম চৌধুরী লজ, মাঝেরটি আনন্দ লজ এবং সর্ব বাঁয়ে মহারাজা লজ। প্রতিটি প্রাসাদের প্রবেশপথে আছে সিংহ দরজা। ভবনগুলোর পেছনে রানীপুকুর ও পাসরাপুকুর নামে দুটি পুকুর আছে।

বিকেল ৫টার মধ্যে মহেড়া জমিদার বাড়ি ঘুরে দেখলাম। এবার ফেরার পালা। রাত ৮ নাগাদ আমরা পৌছে গেলাম চিরচেনা ঢাকা শহরে। গাড়ির চালককে কে ৬০০০ টাকার সাথে ৫০০ টাকা বাড়তি দিলাম বকসিস। আমাদের আটজনের এ ভ্রমণে আমাদের জনপ্রতি খরচ হলো ১৪০০ টাকার একটু বেশি।

আপনারাও এরকম কয়েকজন মিলে ঘুরে আসতে পারেন টাঙ্গাইলের এসব ঐতিহ্যবাহি স্থান আর স্থাপনা থেকে। তবে সবার কাছেই একটা অনুরোধ রেখে লেখাটা শেষ করলাম। ভ্রমণে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা বিশেষ করে প্লাস্টিক বোতল, প্লাস্টিক প্যাকেট ফেলে পরিবেশ দূষণ করবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *