ঘুরে এলাম উজবেকিস্তান (প্রথম পর্ব)

লেফটেনান্ট জেনারেল (অবঃ) জাফরুল্লাহ সিদ্দিক

উজবেকিস্তান মধ্য এশিয়ার একটি দেশ। এটাকে ডাবল ল্যান্ডলক্ড দেশ বলা হয়, কারণ এর সব প্রতিবেশি দেশগুলিও ল্যান্ডলক্ড, অর্থাৎ সমুদ্র উপকূলহীন।এর চারপাশে আছে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান আর তুর্কমেনিস্তান। পামীর মালভূমি থেকে নেমে আসা বিখ্যাত আমু দরীয়া আর সীর দরিয়ার মাঝের এই অঞ্চলটি খুবই উর্বর, দেশটির পূর্ব দিকে পার্বত্য অঞ্চল হলেও পশ্চিম দিকে আছে বিস্তীর্ণ সবুজ তৃণভূমি আর ফসলের মাঠ। এই এলাকা একসময় তূরান নামে পরিচিত ছিল। এখানে সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় খৃস্টপূর্ব ৮ম শতকে, একসময় এই অঞ্চল পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়, তারপর আলেকজান্ডারের গ্রীক সাম্রাজ্যের। ৮ম খৃস্টাব্দে এই এলাকা মুসলিমদের অধিকারে আসে, অধিকাংশ লোক তখন ইসলামে দীক্ষিত হয়। ১৪ শতকে উজবেক নেতা তৈমুর লঙ এই এলাকায় প্রতিপত্তিশালি হয়ে ওঠেন এবং বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তিনি নিজেকে তূরানের আমীর আযম হিসাবে ঘোষণা করেন। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে জারের রাশিয়ার হাতে পতনের আগে পর্যন্ত এখানে মুসলিম শাসন চলছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর স্বাধীন উজবেকিস্তান প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়।

আমার অনেক দিনের শখ, উজবেকিস্তান বেড়াতে যাব, কিন্তু ভিসা পাওয়ার ঝামেলা চিন্তা করে সবসময় পিছিয়ে গেছি। অনুজপ্রতিম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিকুল আলম খবর নিয়ে জানালো যে, এখন অনলাইনে ভিসা পাওয়া যাচ্ছে। ভাবলাম, এমন সুযোগ হারানো ঠিক হবে না। শফিককেই দায়িত্ব দিলাম সব ব্যবস্থা করার জন্য। শফিক আরো কয়েকজন উৎসাহি সাথী জোগাড় করে ফেলল। শেষ পর্যন্ত ১০ জনের গ্রুপ তৈরি করে ফেললাম আমরা।

উজবেকিস্তান ছিল মধ্যযুগের মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু, প্রাচীন সিল্ক রোডের অংশ ছিল তাসখন্দ, সমরকন্দ, বুখারা আর খীবা, এই শহরগুলিই জ্ঞান চর্চা আর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য বিখ্যাত ছিল তখন। আমরা এই ৪টি শহরই দেখব। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিউন-এর ভাঙ্গনের পর স্বাধীনতা লাভ করা এই দেশটি এখন অর্থনৈতিক উন্নতি করছে, সেখানে মাথাপিছু গড় আয় ৭৫০০ ডলার। আয়তন ৪লাখ ৪৯ হাজার বর্গ কিলোমিটার। প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখার ৮৯ শতাংশই মুসলিম। এদের প্রধান রফতানি দ্রব্য সোনা, তামা, ইউরেনিয়াম, তেল, গ্যাস, তুলা ইত্যাদি।  ইদানিং ভিসা সহজ করার পর পর্যটন থেকেও তাদের অনেক আয় হচ্ছে।

১৯ এপ্রিল ২০১৯, ঢাকা থেকে কলকাতার পথে রওনা হলাম স্পাইস জেট এয়ারলাইন্সে। ঢাকা থেকে সরাসরি উজবেকিস্তানের রাজধানি তাসখন্দ যাবার কোন প্লেন নাই, দিল্লি হয়ে যেতে হয়। কলকাতা হয়ে দিল্লি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। রাতটা কাটালাম, এয়ারপোর্টের কাছেই র‌্যাডিসন ব্লু-তে।

পরদিন দুপুরে দিল্লি এয়ারপোর্ট পৌছার পর জানতে পারলাম, উজবেক এয়ারলাইনসের প্লেন ৪ ঘন্টা লেট। মনটা খারাপ হলেও কিছু করার নাই। লাগেজ চেক ইন করে বোর্ডি পাস নিলাম। এরপর ১০ জনের জমজমাট আড্ডাতে সময় যে কখন পার হয়ে গেল, টেরই পেলাম না। রাত সাড়ে নয়টায় প্লেন ছাড়ল, তখন জানতে পারলাম, আমাদের পৌঁছাতে ৬ ঘন্টা লাগবে। স্বাভাবিক অবস্থায় ২ ঘন্টা লাগার কথা, পাকিস্তানের এয়ারস্পেস বন্ধ করে দেয়ার কারণে আমাদের যেতে হবে আরব সাগর পার হয়ে ইরান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান পাড়ি দিয়ে। কি আর করা, এ অবস্থাটাতো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ভোর রাতে বিধ্বস্ত অবস্থায় পৌঁছুলাম তাসখন্দ এয়ারপোর্টে।

ছবি: লেখক

স্থানীয় সময় তখন ৩টা। বাংলাদেশে তখন ভোর ৪ টা। এখানে একটা মজার অভিজ্ঞতা হলো। আমার স্ত্রী হুইল চেয়ার প্যাসেঞ্জার হিসাবে বোর্ডিং পাস নিয়েছিলেন দিল্লীতে, এখানে আসার পর সব হুইল চেয়ার প্যাসেঞ্জারদের ওরা আলাদাভাবে প্লেন থেকে নামালো, বিশেষ ধরনের লিফট লাগানো গাড়ীতে করে, লিফটা একেবারে প্লেনের দরজার লেভেলে উঠে গেল। আমি আগে কোন এয়ারপোর্টে এরকম ব্যবস্থা দেখিনি।

আমরা বাকি যাত্রীরা বিমান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমেছি, তারপর বাসে করে টার্মিনালে এসেছি। ইমিগ্রেশন শেষ করে, লাগেজ সংগ্রহ করে বের হয় আসতে আসতে প্রায় ৪টা বেজে গেল। ইমিগ্রেশনে কোন ঝামেলা হয়নি, কিছুই জিজ্ঞেস করেনি, অনলাইন ভিসার কাগজ দেখেই পাসপোর্টে সীল মেরে দিল। বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল আমাদের গাইড, মিঃ আবরার।

সরাসরি হোটেলে চলে গেলাম আমরা, এয়ারপোর্ট থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের পথ। হোটেলটা ছোট্ট, কিন্তু ব্যবস্থা বেশ ভাল। কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে, নাস্তা খেয়ে, ১১টার দিকে বের হলাম শহর দেখতে।

তাসখন্দ, উজবেকিস্তানের রাজধানি। প্রায় ২২০০ বছরের পুরানো শহর এটা। ১৩০ বর্গমাইল আয়তনের এই শহরের লোকসংখা প্রায় ৩০ লক্ষ। উজবেকিস্তানের পূর্ব প্রান্তের এই শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। ৮ম শতাব্দিতে মুসলিম অধিকারের পর থেকে এই শহরের প্রভূত উন্নতি হয়। কিন্তু  ১২১৯ সালে চেঙ্গিস বাহিনীর আক্রমণে শহরটি প্রায় সম্পুর্ণ ধংসপ্রাপ্ত হয়। এরপর শহরটি আবার জেগে ওঠে, সিল্ক রোড বাণিজ্যের কারণে আবার এই এলাকা সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরে পরিণত হয়।

১৮৬৫ সালে এটা রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনে রূশ তুর্কীস্তানের রাজধানী হিসাবে এবং পরে সোভিয়েত আমলে উজবেক রিপাবলিকের রাজধানী হিসাবে অনেক উন্নতি লাভ করে। এটা সোভিয়েত ইউনিয়েনের ৪র্থ বৃহত্তম শহর ছিল। ১৯৬৫ সালের পাক ভারত যুদ্ধের পর আইউব খান আর লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মধ্যে বিখ্যাত শান্তি সম্মেলনটি এই শহরেই হয়েছিল। ১৯৬৬ সালের মারাত্মক ভূমিকম্পে এখানকার বেশিরভাগ দালানকোঠা গুঁড়িয়ে যায়। পরে শহরটিকে আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয়। তবে তাসখন্দের ঐতিহ্যবাহি স্থাপত্যের নিদর্শনগুলির বেশিরভাগই কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।

আমাদের প্রথম কাজ ছিল ডলার ভাঙ্গিয়ে এখানকার মুদ্রা সোম সংগ্রহ করা। আবরারকে বলতেই সে আমাদের নিয়ে গেল ব্যাংকে, আমরা ভয় পাচ্ছিলাম, বাইরের মানি এক্সচেঞ্জ থেকে হয়তো ঠকাতে পারে। তবে আবরার অভয় দিল, এখানে সরকারি বেসরকারি সবার এক্সচেঞ্জ রেট একরকম, কোথাও ঠকার কোন ভয় নাই।

এক ডলারে পাওয়া গেল ৮৪০০ সোম, অর্থাৎ আমাদের ১ টাকা এদের প্রায় ১০০ সোমের সমান। আমি ২০০ ডলার ভাঙ্গিয়ে পেলাম মোট ১৬,৮০,০০০ সোম। কিছু ১ লাখ সোমের নোট, কয়েকটা ৫০ হাজারের নোট আর বাকি সব ১০ হাজারের নোট। এত নোট গুনে সামলিয়ে রাখা বিরাট ঝামেলা। দলের সবাই প্রায় সম পরিমান ডলার ভাঙ্গালো। বেশ কিছু সময় ব্যয়ও হলো এখানে।

এরপর গেলাম হাস্ত ইমাম ইসলামিক সেন্টারে। সেখানে আছে খুব সুন্দর তেলিয়াশেখ মসজিদ এবং কোরান মিউজিয়াম। হযরত উসমানের সহস্থে লিখিত কোরআন এখানে রক্ষিত আছে। বলা হয়ে থাকে যে, আততায়ীদের হাতে নিহত হবার সময় খলিফা এই কোরআন পাঠ করছিলেন, ওনার রক্ত লেগেছিল এই কোরআনে। তৈমুর লঙ বাগদাদ দখল করার পর এটা সমরখন্দে নিয়ে আসেন। জারের আমলে এটা সেন্ট পিটারসবার্গের মিউজিয়ামে স্থানান্তর করা হয়। ১৯২৫ সালে সোভিয়েত আমলে এটা তাসখন্দে নিয়ে আসা হয়। আমরা ভক্তি সহকারে কূফি হরফে লেখা এই কোরআন শরীফ দেখলাম এবং অন্যান্য অনেক ঐতিহাসিক পুরানো কোরআনও দেখলাম। ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ, তাই কোন ছবি নিতে পারিনি। এর পাশেই আছে কূকেলদাস মাদ্রাসা, ১৫৫৭ সালে আমির আবদুল্লাহ খান এটা তৈরী করেন, বিশাল নান্দনিকশৈলীতে নির্মিত এই ভবনটি এখনও মাদ্রাসা হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। তবে অদূর ভবিষ্যতে এটাকে মিউজিামে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

এরপর আমরা কিছু সময় কাটালাম, আমীর তিমুর স্কোয়ারে, বিশাল দৃষ্টিনন্দন পার্কের মাঝখানে বিরাট অশ্বারোহী তৈমুরের মূর্তি। তৈমুরকে উজবেকিস্তানের জাতীয় বীর হিসাবে গন্য করা হয়। কালো পাথরে খচিত মূর্তিটি সত্যিই দেখার মত। রা্স্তার অপর পারে তীমুর মিউজিয়াম। নীল রঙের গম্বুজ বিশিষ্ট দালানটির ভিতরে রয়েছে অপরূপ কারুকার্য, যা ইসলামি স্থাপত্যের নিদর্শন।

আমাদের গাইড এরপর নিয়ে গেলেন আলিশের নভয় অপেরা এণ্ড ব্যালে থিয়েটার দেখতে। দালানটির স্থাপত্যশৈলী দেখার মত। মস্কোতে অবস্থিত লেনিনের সমাধির বিখ্যাত স্থপতি আলিক্সি চুসেভ এই ভবনটির ডিজাইন তৈরী করেছিলেন। ২য় মহাযুদ্ধের সময় জাপানি যুদ্ধবন্দিদের দিয়ে এটা তৈরী করানো হয়েছিল। সময়ের স্বল্পতার কারণে ব্যালে দেখা হলনা। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ফিরে এলাম।

এরপর দেখলাম ইনডিপেনডেন্স স্কোয়ার। স্বাধীনতা মনুমেন্টও এখানে অবস্থিত। সোভিয়েত আমলে এখানে ছিল রাশিয়ার সবচেয়ে বিশাল লেনিনের মূর্তি, ১৯৯১ সালের সেটা সরিয়ে ফেলা হয়। সে জায়গায় এখন একটা বিশাল ভূগোলকের মাঝে উজবেকিস্তানে মানচিত্র। এর কাছেই রয়েছে, ওয়ার মেমোরিয়াল। খুবই সুন্দর একটা পার্কের মাঝে, একটা ইটারনাল ফ্লেম, তার সামনে রয়েছে মৃত সন্তানদের জন্য শোকে কাতর এক মায়ের বিশাল মূর্তি। এখানে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নিহত প্রায় আড়াই লক্ষ উজবেক শহীদদের নাম ব্রোঞ্জ ফলকে খচিত আছে। ২য় মহাযুদ্ধে প্রয় ১৫ লাখ উজবেক যোদ্ধা সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল, যা ছিল তখনকার উজবেক জনগোষ্ঠির শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ। আমরা এখানে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছি।

এরপর আমরা গাড়িতে চড়ে তাশখন্দ শহরটা একটু ঘুরে দেখলাম, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি ভবনগুলি এবং রাস্তা পার্ক ইত্যাদি সম্বন্ধে ধারনা নেবার জন্য। শহরটি আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছে, রাস্তাগুলি বেশ চওড়া, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম, তেমন ট্রাফিক জ্যাম নেই। রাস্তার দুপাশেই সবুজ গাছের সারি, এছাড়াও রয়েছে অনেক দৃষ্টিনন্দন পার্ক, পানির ফোয়ারা আর সুন্দর ভাস্কর্য। শহরে আকাশচুম্বি দালান নেই বললেই চলে।

তাসখন্দ পোলাও সেন্টার। ছবি: লেখক।

এরপর আমাদের নেয়া হলো, তাসখন্দ পোলাও সেন্টারে। বিশাল বিশাল সাইজের পাতিলে পোলাও রান্না হচ্ছে, প্রতি পাতিলে প্রায় ১০০ কেজি চাল আর প্রায় সমপরিমান ভেড়ার মাংশ দিয়ে, অনেকটা আমাদের বিরিয়ানির মত পাকানো হচ্ছে। একই সারিতে সাজানো এরকম অনেকগুলি পাতিলে রান্না হচ্ছে। ভিতরে বিশাল বসবার জায়গা, একসাথে পায় ৫০০ লোক বসে খেতে পারে, সবাই শুধু পোলাও-ই খাচ্ছে, অন্য কোন খাবার পাওয়া যায়না এই সেন্টারে। আমরাও খেলাম, ভালই লাগল খেতে। আমাদের বিরিয়ানির মত এত বেশি মশলা দেয়না এরা। পোলাও এর সাথে কম্প্লিমেন্টারি আনলিমিটেড গ্রীন টি আর রুটি থাকে। পোলাও এদের ন্যাশনাল ডিস, ওরা বলে প্লাভ, ওদের নাকি ৩০০ রকমের পোলাও রেসিপি আছে। একেক অঞ্চলের একেক রকম পোলাও। চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *