গ্রীষ্মে চলনবিল

ছবি: মুস্তাফিজ মামুন

মুস্তাফিজ মামুন

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং সমৃদ্ধ জলাভূমির নাম চলনবিল। নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বড় একটি অংশ জুড়ে এ বিলের অবস্থান। বর্ষা মৌসুমে এ বিল পানিতে পরিপূর্ণ থাকলেও শীতে শুকিয়ে যায়। তখন থেকে এ বিলে চাষ হয় নানান সশ্য। বর্ষায় পানি আসার আগে চলনবিলে সর্বশেষ ফসল হলো বোরো ধান। পুরো বিলজুড়েই এখন চলছে বোরো কাটার মহোৎসব।

ব্রহ্মপুত্র নদ যখন তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেয়, সে সময় চলনবিলের সৃষ্টি। গঠিত হবার সময় চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় ১, ০৮৮ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে এর আয়ন অনেক কমে এসেছে। চলনবিল মূলত অনেকগুলো ছোট ছোট বিলের সমষ্টি। বর্ষায় এই বিলগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে একসঙ্গে বিশাল বিলের সৃষ্টি হয়। সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ, পাবনা জেলার চাটমোহর এবং নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলা জুড়ে এ বিলের বিস্তৃতি। বিলটির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত পাবনা জেলার নুননগরের কাছে অষ্টমনীষা পর্যন্ত গিয়ে থেমেছে। এর প্রশ্বস্ততম দিকটি উত্তর-পূর্ব কোনাকুনি। নাটোরের সিংড়া থেকে গুমনী পাড়ের কাচিকাটা পর্যন্ত এ বিলের দীর্ঘতম অংশ লম্বায় প্রায় চব্বিশ কিলোমিটার। নাটোরের সিংড়ার পূর্বপ্রান্ত থেকে পাবনার তাড়াস উপজেলার ভদাই নদীর পূর্ব তীর পর্যন্ত বিলের পূর্ব সিমানা।

চলনবিলে ধানকাটা দেখতে যেতে পারেন এ বিলের নাটোর অংশে। জেলার সিংড়া উপজেলার অনেক জায়গাজুড়ে এ বিলের রাজত্ব আছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জের হাটিকুমড়ুল থেকে বনপাড়া পর্যন্ত দীর্ঘ সড়ক তৈরি হয়েছে চলনবিলের ওপর দিয়েই। সড়কের দুপাশের প্রায় সব যায়গাতেই চলছে ধান কাটার উৎসব। এ পথে চলতে চলতে সড়কের দুপাশেই আছে বিস্তীর্ণ পাকা বেরো ধানের ক্ষেত। এ সড়কের যে কোন যায়গায় থেমে বিলের ভেতরে ছোট কোন সড়ক ধরে একটু ভেতরে ঢুকে পড়ুন। যতোই ভেতরের দিকে যাবেন ধান কাটার সৌন্দর্য ততো বেশিই চোখে পড়বে। দীর্ঘ মেঠো পথে ধুলো উড়িয়ে, কোথাও কাদা মাড়িয়ে মহিষের গাড়ি বোঝাই করে ধান নিয়ে ফিরছেন কৃষক, কোথাও আবার ধান বোঝাই মহিষের গাড়ি নদী-খাল সাঁতরে পার হচ্ছে। মাঠের ভেতরে কিংবা বাড়ির আঙ্গিনা জুড়ে কোথাও আবার চলছে ধান মাড়াই, কোন কোন বাড়িতে চলছে ধান সিদ্ধ কিংবা ধান বানার কাজ। গ্রাম বাংলার চিরচেনা এসব দৃশ্য দেখতে হলে যেতে হবে চলনবিলে।
কীভাবে যাবেন
এ ভ্রমণে নিজস্ব গাড়ি কিংবা কয়েকজন মিলে ভাড়া করে গাড়ি নিয়ে যাওয়াই ভাল। এছাড়া ঢাকার গাবতলি থেকে নাটোর কিংবা রাজশাহীগামী যে কোন বাসে উঠে নামতে পারেন চলনবিলে। এ পথে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, ন্যাশনাল পরিবহনের বাস ভাল। ভাড়া ৪৫০-৮০০টাকা। এছাড়া বগুড়াগামী যেকোন বাসে উঠেও নামতে পারেন হাটিকুমড়ুল মোড়ে। সেখান থেকে স্থানীয় বাহনে আসতে পারবেন চলনবিলে।
কোথায় থাকবেন
এ ভ্রমণে রাতে থাকার প্রয়োজন নেই। তবে থাকতে চাইলে ভ্রমণে শেষে নাটোর জেলা সদরে এসে রাতে থাকতে পারেন। সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে নাটোর শহরে। শহরের চকরামপুরে হোটেল ভিআইপি, মাদ্রাসা রোডে হোটেল উত্তরা, হোটেল মিল্লাত, কানাইখালীতে হোটেল আরপি, হোটেল রুখসানা ইত্যাদি। এসব হোটেলে ২০০-১২০০ টাকায় কক্ষ আছে
প্রয়োজনীয় তথ্য
চলনবিলে বোরো ধান কাটা দেখতে হলে যেতে হবে মে মাসের যে কোন সময়। বিলের ভেতরের সড়কগুলো গাড়ি চলাচলের উপযোগী নয়। সর্বশেষ পাকা সড়কে গাড়ি রেখে বাকি পথ হেঁটেই যেতে হবে। এ সময়ে রোদও প্রখর। সঙ্গে অবশ্যই ছাতা কিংবা রোটটুপি নিতে হবে তাই। সঙ্গে পানির বোতল নিতে ভুলবেন না। বিলের মধ্যে খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। তাই দুপুরের জন্য পর্যাপ্ত খাবার সঙ্গেই নিয়ে যেতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *