কেরালার হাউসবোটে দিনরাত

ছবি: লেখক

মুহাম্মদ হাসানুর রাসেল

আগের রাতে ফিশ ফ্রাই খেয়ে হোটেলে ফিরে যখন ঘুমাতে গেলাম তখন রাত প্রায় বারোটার কাছাকাছি। ক্লান্ত শরীর নিয়ে হিমশীতল কামরায় লেপ মুড়ি দিতেই ঘুমেররাজ্যে হারালাম। ঘুমটা যখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছে নিজের রাজত্বে তখনই বেরসিক এলার্ম বেজে উঠলো…।

কি আর করা, কোন মত নিজেকে তুলে নিয়ে শাওয়ারের নীচে ছেড়ে দিলাম। ট্যুরে বের হলে খুব সকাল সকাল উঠে রওনা দেয়ার জন্য এর চেয়ে ভাল কিছুনাই। যাই হোক নিজে তৈরি হয়ে বাকি সবাইকে তাড়া দিলাম তৈরি হয়ে নিতে। আজও ভোর পাঁচটা নাগাদ চেকআউট করতে হবে হোটেল থেকে। ঠিক ভোররাত পাঁচটা দশে আমরা যখন গাড়িতে চেপে বসলাম, ড্রাইভার মিঃ বিনয় পিযোশ আমাকে বিনয়ের সঙ্গে মনে করিয়ে দিল যে, আমরা দশ মিনিট লেট!

সেবারের ভারত ভ্রমণের ভ্রমণসূচী ছিল ষোলদিনে কেরালার মুন্নার, আলিপ্পে, কুমারকোম, থিক্কাদি, কণ্যাকুমারী, কোভালাম, কোচিন নয়দিনে কাভার করে গোয়ায় তিন দিন আর মুম্বাইয়ে দুই দিন কাটিয়ে মুম্বাই হতে ঢাকায় ফেরা। আর এই অল্প সময়ে উপরে উল্লেখিত কেরালার গন্তব্যসমূহে নয়দিনে ভ্রমণ সম্পন্ন করতে আমাদের আগের টানা চারদিন ভোররাতে উঠে হোটেল থেকে চেকআউট করে ছুটতে হয়েছিল পরবর্তী গন্তব্যে, আবার হোটেলে চেকইন করছি সন্ধ্যেরপরে, কখনো রাতের বেলায়। ফলে ভ্রমণে বের হয়ে আরামে হোটেলরুমে অবসর সময় তো দূরের কথা, ঠিকমত ঘুমানোর সময়টুকুও পাওয়া যায় নাই। তাই এদিন সান্ত্বনার ব্যাপারছিল একটা, পরেরদিন ভোরবেলা আর এই কষ্ট পোহাতে হবেনা। কারণ, আজকের গন্তব্য কেরালার বিখ্যাত ব্যাকওয়াটারে হাউজবোটে করে ঘুরে বেড়ানো।

ছবি: লেখক

কেরালা’র ব্যাকওয়াটার নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। ব্যাকওয়াটার মূলত এমন একটি জলাধারকে বুঝায়, যা মূল নদী হতে সৃষ্ট একটি শাখা যেখানে স্রোত প্রায় নেই বললেই চলে। অনেকটা ড্যাম এর মত স্থির পানির জলাধার যা নদীর একটি অংশ হতে সৃষ্ট হয়ে পূনরায় নদীতে গিয়ে কোথাও মিলিত হয়েছে। সাধারণত নদ-নদীর গতিপথে সরুমুখ বিশিষ্ট বিশালাকার নিম্নভূমি জুড়ে এই ব্যাকওয়াটার এর দেখা পাওয়া যায়।

আমাদের দেশের বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চলেও এরকম জলাভূমি দেখা যায়। ভারতের সর্ব দক্ষিণের মূল ভূখন্ডের রাজ্য কেরালা। এই কেরালা’র আলিপ্পে অঞ্চল সারা বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত তার ব্যাকওয়াটার এর জন্য। কেরালা রাজ্যের এই ব্যাকওয়াটার এর বিস্তৃতি প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার ব্যাপ্তি নিয়ে ছড়িয়ে আছে যার মধ্যে পড়েছে প্রায় ৩৮টি নদী এবং ৫টি বড় লেক। আর এই জলপথ প্রাচীনকাল থেকেই কেরালার অধিবাসীদের জন্য সব ধরনের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কেরালায় টুরিস্টদের আনাগোনা বেড়ে গেলে পরে এই হাউজবোটগুলো আরও আধুনিক এবং আরও বেশী সুযোগ সম্বলিত হয়ে আজকের কেরালা রাজ্যের ট্যুরিজম বাণিজ্যের প্রসারে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে।

ছবি: লেখক

ফিরে যাওয়া যাক, আমাদের সেই ভ্রমণ গল্পে। তো আমরা সেই ভোর রাতে রওনা দিলাম আলিপ্পের উদ্দেশ্যে। তামিলনাড়ুর কণ্যাকুমারী হতে আমাদের গাড়ী ছুটে চলল আড়াইশ কিলোমিটার দূরের কেরালা রাজ্যের আলিপ্পে শহরের দিকে। বেলা নয়টা নাগাদ ত্রিভান্দ্রাম পার হয়ে একটা রোডসাইড ধাবা টাইপের রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সারা হলে পরে ফেরযাত্রা। ২৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বেলা ১২টা নাগাদ এসে পৌঁছলাম আলিপ্পে। সরাসরি চেকইন হাউজবোটে।

ছবি: লেখক

কেরালার হাউজবোটগুলো সত্যিই চমৎকার। কাঠ, বাঁশ আর কিছু ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরী এই নৌকাঘর গুলোতে রয়েছে বেডরুম, ড্রইংরুম, ডাইনিংরুম, কিচেনসহ একটি ফ্ল্যাটের সকল সুবিধা। বিগস্ক্রিন এলইডি টিভি, ডিভিডিপ্লেয়ারসহ সবকিছু।

আলিপ্পের বিখ্যাত রামাদা হোটেল সংলগ্ন জেটিতে আমরা যখন পৌঁছলাম; তখন ঘড়িতে প্রায় এগারোটার উপরে। আমাদের হাউজবোটে চেকইন করার সময় সকাল দশটায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছে শুনি; এখনো হাউজবোট রেডি হয় নাই। পরে জানতে পারিযে, আমাদের আসতে একটু দেরী হবে শুনে ভোরবেলা ঘন্টা তিনেকের জন্য আরেকটা ইউরোপীয় পর্যটক গ্রুপকে নিয়ে ব্যাকওয়াটার ট্যুর করে এসেছে।

বেশ কিছুটা সময় অপেক্ষার পর আমরা পদার্পন সরতে পারলাম আমাদের আগামি ২৪ঘন্টার নিবাস, `গোল্ডেন মিস্ট ইয়ট’ এ। দুই বেডরুম, ডাইনিং এন্ড ড্রইং স্পেস, পেছনে রান্নাঘর, তারও পেছনে ইঞ্চিন রুম, জেনারেটর; মোটামুটি সুন্দর আয়োজন। কেরালার হাউজবোট গুলো সিঙ্গেল রুমের থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দশ বেড রুমের দ্বিতলও হয়ে থাকে। এছাড়া শখানেক লোক নিয়ে পিকনিক টাইপ আয়োজন করার মত ভিন্ন ধরনের হাউজবোটও রয়েছ। সকাল বেলা চেকইন করে পরদিন সকাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটারের ব্যাকওয়াটার রাইড করে ফের আগের যায়গায় ড্রপকরে দেয় তারা। রাতে প্রতিটি বোটের নিজস্ব কোন স্থল আবাসের সংলগ্ন স্থানে পার্ক করা হয় বোট। সেখান হতে কানেকশন দিয়ে রাত ৯টা টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বেডরুমগুলোতে এসি সংযোগ দেয়া হয়।

এই ২৪ ঘন্টার ট্যুরে তিন বেলার মূল খাবারের সাথে সকাল বিকাল হালকা নাস্তা, চা দেয়াহয়। ভাড়া বোটভেদে ৫,০০০ রুপি থেকে ৮,০০০রুপি প্রতি সিঙ্গেল রুমের জন্য। প্রতি রুমে ডবলবেড; দুই জন গেস্টের জন্য। এক্সট্রা ম্যাট্রেস দিয়ে তৃতীয় একজন থাকা যায় রুমে; সে ক্ষেত্রে থার্ড পারসনের জন্য আলাদা চার্জ করা হয়।

ছবি: লেখক

যাইহোক আমরা চেকইন করে কিছু ছবি তুলে রুমে গিয়ে গোসল সেরে বোটের সম্মুখ পানের ড্রইং রুমে বসে ভুবন খ্যাত কেরালার ব্যাকওয়াটারের সৌন্দর্য উপভোগ করার মাঝে ডাইনিং টেবিলে খাবার চলেএল। আইটে মমন্দ নয়; ভাত, দুই তিন পদের সবজি, রূপচাঁদা ফ্রাই, কেরালার নারিকেল ডাল জাতীয় একটাপদ…। কেরালার স্পাইস দিয়ে রান্না করা খাবার পেটপুরে খেলাম। যদিও আমার ভ্রমণসঙ্গীরা বরাবরের মতোই তৃপ্তি করে খেতে পারলোনা। শেষে রাতের খাবারের জন্য রান্না ঘরে গিয়ে আমাদের বোটের রাঁধুনি ভদ্রলোককে গিয়ে মসলা দেখিয়ে নির্দেশনা দিয়ে দেয়া হল এর বাইরে যেন কোন মসলা না ব্যবহার করে। কিন্তু ভদ্রলোক যথারীতি কিছু কেরালার কমন মসলা রাতের চিকেন আইটেমে দিয়ে আমি ছাড়া সবার রসনা বিলাস পূরণে ব্যর্থ হয়েছিলেন। খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ আড্ডা চলল। এরপর দুপুর তিনটে নাগাদ কিছুক্ষণ ভাতঘুম দেয়ার বিলাসিতা করারও সময় মিলল আমাদের। যা গত এক সপ্তাহের দৌড় ঝাঁপের সাথে তুলনা করলে এক কথায় অকল্পনীয়!

ছবি: লেখক

বিকেলবেলা পাকোড়া আর চা দিয়ে নাস্তা করতে করতে বোট এসে ভিড়ল একটা ছোট্ট গ্রামে। সারি সারি বোট ভিড়ে আছে সেখানে। বোট থেকে নামতে দেখলাম ছোট ছোট দোকান, স্থানীয় নারী-পুরুষ চালাচ্ছে সেসব। নানান মাছ, ফল, আইসক্রিম, নানানপদের সফট ড্রিংকস, চকোলেট, চিপস ইত্যাদি সাজিয়ে বসেছে। আমরা সেখান থেকে রূপচাঁদা কিনে নিলাম, প্রতি পিস দুইশত রুপিতে। সেই রূপচাঁদা আমাদের বোটের শেফকে দিয়ে দিলাম।

সন্ধ্যের পর যখন মেমোরি কার্ড থেকে (বোটেইছিল) ‘বাজরাংগিভাইজান’ সিনেমাটি দেখছিলাম আর ৯টা বাজার অপেক্ষা (অত্যাধিক গরমে অস্থির তখন); তখন সেই মাছ ফ্রাই করে নিয়ে এল আমাদের শেফ বাহাদুর। আমার এই এক জীবনে যত মাছ ভাজা খেয়েছি; তা ছিল সবচেয়ে সেরা। পারফেক্ট মসলা, ঝাল এবং ফ্রাই। সফট এন্ড ইয়াম্মি… তখন দুঃখ হল কেন আরও এক পিস করে কিনে নিলাম না। এরপর মুভি শেষে রাতের খাবার; ভাত, সবজি, ডাল, মুরগীর মাংস, সালাদ। এবার যদিও মসলার যন্ত্রণা কিছুটা কম ছিল, কিন্তু এক্কেবারেই ছিলনা বলা যাবেনা। আমাদের শেফ চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞাসা করেছিল, এসব মসলা ছাড়া কিভাবে রান্না করা যায়।

ছবি: লেখক

শেফ প্রসঙ্গে বলি, আমি বিকেল বেলা চায়ের খোঁজে রান্না ঘরে গিয়ে দেখি সে রাতের খাবারের আয়োজন করছে। তখন তার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, তিনি পেশায় কি করেন? উত্তরে বললেন, রান্না । আমি এবার জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়? কোন রেস্টুরেন্ট নাকি হোটেলে?। সে অবাক হয়ে উত্তর দিল, কেন? এই বোটে। আমি আরও অবাক হয়ে বললাম, মানে কী? সারা মাস এই বোটে গেস্ট আসে? সে আমাকে আরও অবাক করে জানাল, মাসে ২২ থেকে ২৬ দিন টানা বুকিং থাকে। সারা ভারতে তাদের ছয়টি এজেন্টের মাধ্যমে গেস্ট আসে, কখনো একই দিনে দুই দল গেস্ট চলে আসলে সামলাতে মুশকিলহয়। যেমন আজ সকালটায় হয়েছিল।

ছবি: লেখক

গল্পে গল্পে আরও জানা গেল, কেরালার এই হাউজবোট ইন্ডাস্ট্রির অনেক কথা। ইন্ডাস্ট্রি শুনে অবাক হচ্ছেন? কেরালা ব্যাকওয়াটারের হাউজবোটে একদিন না কাটালে বুঝা যাবেনা সেই কর্মযজ্ঞ। আমরা গিয়েছিলাম অফসিজনে। তখনই হাজারে হাজার বোট চলতে দেখেছি সেখানে। তো আজকের গল্প এখানেই শেষ। খাবার শেষে ঘুমাতে গেলাম। অনেকদিন পর সকালে উঠার তাড়া নেই। কাল সকাল দশটার পর হাউজ বোট হতে চেকআউট। সো… নোটেনশন… বহুদিন পর আরামে ঘুমাতে পারবো যেন…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *