এক মোগল পুলের খোঁজে

ছবি: রিদওয়ান আক্রাম

রিদওয়ান আক্রাম

নারায়ণগঞ্জের চাপাতলি গ্রামে নাকি মোগল আমলের একটা পুল আছে। তথ্যটা পেয়েছিলাম ফেসবুকেই। প্রথমে বিশ্বাস করতেই মন চাইছিল না। ধুর, গুল মারছে বোধ হয়। একেবারে নাকের ডগায় এত দিন ধরে আস্ত একটা মোগল পুল দিব্যি ৪০০ বছর কাটিয়ে দিল, কেউ জানল না? মোটা মোটা বইয়েও তো এমন কোনো পুলের কথা শুনিনি। গুগলের সাহায্যও নিলাম। না, ওখানেও এই পুলের কোনো হদিস পেলাম না। তারপরও সরেজমিনে একবার যাচাই করে দেখতে ইচ্ছে হল, যদি থাকে। আসাদ ভাইকে বলতেই তিনিও এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। অবশেষে আসাদ ভাইয়ের দুই চাকায় চেপেই ঢাকা থেকে রওনা হলাম। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে অল্প সময়ের মধ্যে হাজির হলাম মদনপুর। সেখানে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করতেই হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল চাপাতলি গ্রামে যাওয়ার পথ। সরু একখানা রাস্তা সোজা এসে মিশেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। সেই সরু রাস্তা ধরে মহাসড়ক থেকে নেমে গেল আমাদের মোটরবাইক। যাচ্ছি তো যাচ্ছি। এমন সময় মনে হলো, আশপাশের কাউকে জিজ্ঞেস করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। একজনকে জিজ্ঞেস করার পর মনে হলো, আরেকটু আগে এই বুদ্ধিমত্তা দেখালে ভালো হতো। কেননা পেছনেই নাকি চাপাতলি যাওয়ার রাস্তাটা ফেলে এসেছি। অগত্যা মোটরবাইকটি আবার ঘোরাতে হলো।

 

খানিকটা যেতে পাওয়া গেল রাস্তাটা। এটাই নাকি সোজা চলে গেছে চাপাতলি গ্রামে। বলছি ‘গ্রাম’, আদতে এটা এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অংশ। কংক্রিটের ঢালাইয়ের রাস্তা তার প্রমাণও দিল। সেই পথ ধরে খানিকটা সামনে যেতে চোখে ধরা পড়ল কাঙ্ক্ষিত সেই পুল। দূর থেকে দেখেই বুঝে গেলাম, পুলটা মোগলদের হাতেই তৈরি। মুন্সীগঞ্জের পোলঘাটার ইটের পুল, সোনারগাঁয়ের পঙ্খিরাজ পুল, পিঠাওয়ালির পুলের মতো দেখতে এই পুলটিও। খিলানের ওপর ভিত্তি করে বানানো। সেই আমলে বানানো ইটের পুলগুলোর মতো এটার নিচে নৌযান চলাচলের জন্য রয়েছে তিনটি পথ। মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড়। আর দুই পাশের পথগুলো ছোট। এসব দেখলে সহজেই বোঝা যায় ছোট-বড় আকারের নৌযানের কথা ভেবেই এভাবে পুলগুলো তৈরি করা হয়েছে।

পুলটার কাছে গিয়ে বাইকটা রাখতে না রাখতে উত্সুক লোকজনের দেখা মিলল। তাদের মধ্য থেকে কথা হলো বদরুল আলম বাদলের সঙ্গে। ভদ্রলোকের বাড়ি পুলটার পাশেই। তিনিই জানালেন, স্থানীয়দের কাছে এটা ‘চাপাতলি ইটেরপুল’ নামেই পরিচিত। সেই ছোটবেলা থেকে পুলটা এভাবেই দেখে আসছেন। যে খালের ওপর পুলটা সেটির নাম অক্ষয় খাল। সময়টা বর্ষা হওয়ায় খালে বেশ পানি। এখনো খালটা নাকি বর্ষার সময় ব্যবহার হয়। বালু বহনকারী ট্রলারগুলো এদিক দিয়ে নিয়মিতই যাতায়াত করে। তার প্রমাণও পাওয়া গেল পুলের মাঝের পথটি ট্রলারের ঘষায় ঘষায় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত। এভাবে চলতে থাকলে একেবারে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে পুলটি। তবে এখন পুলটা ব্যবহার করছে গ্রামের মানুষেরা। এটার দিয়ে দিব্যি রিক্সা থেকে মোটরবাইকের মতো যানবাহন দিব্যি চলে যাচ্ছে।

এবার ছবি তোলার পালা। কিন্তু ছবিটা তুলব কিভাবে? গাছপালা ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে ওটাকে। দূর থেকে এটা যে একটা মোগল পুল, বোঝার কোনো উপায় নেই। আর সেটি ক্যামরাবন্দি করা আরো কষ্টসাধ্য এক ব্যাপার। সায় দিলেন আসাদ ভাইও। তাঁর পেল্লায় ক্যামেরা দিয়েও খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না। ভাবলাম, পুলটার অপর প্রান্তে গিয়ে যদি একটা জুতসই ছবি তোলা যায়? তথাস্তু বলে দিলাম হাঁটা। সমতল থেকে ধীরে ধীরে একটু একটু উঁচু হয়ে গেছে পুলটা। সেই আমলের ছোট ছোট ইটগুলো দন্ত বিকশিত করে হাসছে। পুলের ওপরের অংশের ইটগুলো যে চার সারি করে বিছানো হয়েছে, তা-ও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ওপরের দিকে মাঝের খিলান বরাবর বেশ কিছু পাথরের দেখা মিলল। বোঝাই যাচ্ছে, পুলটার তেমন কোনো সংস্কার করা হয়নি। আমাদের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর হয়তো এই মোগল পুলটার কথা জানেই না। তাদের কোনো সাইনবোর্ডের দেখাও মিলল না। স্থানীয় ফজলুল হকও সায় দিলেন আমাদের এই ধারণায়। চল্লিশোর্ধ্ব এই ব্যক্তির জমি এই পুলের লাগোয়া। সেই জমিতেই তাঁকে চাষরত অবস্থায় পেলাম। তিনি জানালেন, এই পুলটি দিয়ে নাকি রাজা-বাদশারা সোনারগাঁ থেকে ঢাকায় যেতেন। ছোটবেলা থেকে পুলটাকে এমনই দেখে আসছেন। এরশাদের সময় কিছু লোকজন এসেছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন পুলটা ভেঙে নতুন একটা পুল করতে। ভাগ্যিস শেষমেশ সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। এখন শোনা যাচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নাকি এটা সংস্কার করবে। মনে মনে ভাবলাম, যথাযথভাবে সংস্কার হলেই হয়। তাহলে মোগল আমলের একটি ঐতিহ্য রক্ষা পাবে।

ছবি তোলা হতেই তাড়া দিলেন আসাদ ভাই। আমাদের আরেকটা জায়গায় যেতে হবে। জায়গার নাম কাইকারটেক। প্রতি রবিবার ওখানে হাট বসে। একেবারে গ্রাম্য হাট। এখন রওনা দিলে হয়তো হাটটা পাওয়া যাবে। আবার চেপে বসলাম মোটরবাইকে। এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের আশায় বেছে নিলাম লাঙ্গলবন্দ হয়ে যাওয়াকে। লাঙ্গলবন্দের পাশ দিয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। এখানে প্রতিবছর চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে পুণ্যস্নান করতে হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভিড় করে। যেতে যেতে পুণ্যস্নান করার বেশ কিছু ঘাট চোখে পড়ল। এখানে রয়েছে ১৬টি স্নানঘাট, ১০টি মন্দির ও ১০টি আশ্রম। উল্লেখযোগ্য ঘাটগুলোর মধ্যে রয়েছে—অন্নপূর্ণা ঘাট, রাজঘাট, গান্ধীঘাট ও প্রেমতলা ঘাট। মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্নপূর্ণা মন্দির, আদি ব্রহ্মপুত্রের মন্দির, শ্মশান কালী মন্দির অন্যতম। এ ছাড়া আছে ললিত সাধুর আশ্রম, বেণীমাধব ব্রহ্মচারীর আশ্রম, শঙ্কর সাধুর আশ্রম। গান্ধীঘাট নাম শুনে একটু আগ্রহ জাগল খানিকটা যাত্রাবিরতি দেওয়ার। ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম, কাচঘেরা মহাত্মা গান্ধীর এক আবক্ষ মূর্তি। পাশেই কাচঘেরা আরেকটা বাক্স। তাতে একটি পাত্র। এখানকার সেবায়েত জানালেন, এখানে নাকি মহাত্মা গান্ধীর দেহভস্ম রাখা হয়েছে। তাই নাকি! যদিও সেখানে কোনো লিখিত তথ্যাদি পেলাম না। দু-একটা ছবি তুলে আবার রওনা দিলাম। স্থানীয়দের কাছ থেকে পথের খোঁজ নিয়ে অবশেষে হাজির হলাম কাইকারটেকের হাটে। বেশ পুরনো এই হাট। হাটের ভেতর কয়েক শ বছরের পুরনো ধ্বংসপ্রাপ্ত এক স্থাপনার দেখা পেলাম। গরু-ছাগল, কবুতর, ঘরবাড়ি নির্মাণের বাঁশ-কাঠের জন্য হাটটা বেশ প্রসিদ্ধ। তবে বর্ষার ভরা মৌসুমে এখানে নৌকার হাটও বসে। নৌকার ব্যাপারীদের মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখলাম। কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, এবার বন্যা না হওয়ায় ব্যবসা বেশ মন্দা যাচ্ছে। শুনে তো সেই বাগধারার কথা মনে পড়ে গেলে—কারো পৌষ মাস তো কারো সর্বনাশ। গ্রাম্য হাটের পুরো চরিত্রটাই এই কাইকারটেকের হাটে দেখা যাবে। কী নেই এতে। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব উপকরণই উপস্থিত। হাটে এলাম, কিছু না কিনলে চলে? ৫০ টাকায় একটা নিড়ানি কিনে অবশেষে বাড়ির পথ ধরলাম।

কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সোনারগাঁ যাওয়ার বাসে করে মদনপুর আসতে পারেন। ভাড়া ৩০-৪০ টাকার মধ্যে। সেখান থেকে নেমে রিকশা কিংবা হেঁটেই যেতে পারেন চাপাতলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *