আহসান মঞ্জিল জাদুঘর

আহসান মঞ্জিল। ছবি: ট্রাভেল টক

পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক একটি স্থাপনা আহসান মঞ্জিল। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক পরিচালিত একটি জাদুঘর।

পুরনো ঢাকার ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে আহসান মঞ্জিল অবস্থিত। এটি ব্রিটিশ ভারতের উপাধিপ্রাপ্ত ঢাকার নওয়াব পরিবারের বাসভবন ও সদর কাচারি ছিল। অনবদ্য অলঙ্করন সমৃদ্ধ সুরম্য এ ভবনটি ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন।নওয়াব আব্দুল গনির পিতা খাজা আলিমুল্লাহ ১৮৩০ সালে ফরাসিদের নিকট থেকে এই কুঠিটি ক্রয়পূর্বক সংস্কারের মাধ্যমে নিজ বাসভবনের উপযোগী করেন। পরবর্তীতে নওয়াব আব্দুল গনি ১৮৬৯ সালে এই প্রাসাদটি পুন:নির্মাণ করেন এবং প্রিয় পুত্র খাজা আহসানুল্লাহর নামানুসারে এর নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল।

১৯৮৫ সালে আহসান মঞ্জিল প্রাসাদ ও তৎসংলগ্ন চত্বর সরকার অধিগ্রহণ করার মাধ্যমে সেখানে জাদুঘর তৈরীর কাজ শুরু হয়। ১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আহসান মঞ্জিল জাদুঘর জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়।

পরিদর্শনের সময়সূচি

গ্রীষ্মকালীন সময়সূচি
(এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) – (শনিবার-বুধবার) সকাল ১০.৩০ টা – বিকাল ৫.৩০ টা। শুক্রবার- বিকেল ৩.০০ টা – সন্ধ্যা ৭.৩০ টা।

শীতকালীন সময়সূচি
(অক্টোবর –মার্চ) – (শনিবার-বুধবার) সকাল ৯.৩০ টা – বিকাল ৪.৩০ টা। শুক্রবার – দুপুর ২.৩০ টা – সন্ধ্যা ৭.৩০ টা।

সাপ্তাহিক ছুটি বৃহস্পতিবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘরটি বন্ধ থাকে।

প্রবেশ মূল্য
আহসান মঞ্জিলে প্রবেশ মূল্য প্রাপ্ত বয়স্ক বাংলাদেশি ৫ টাকা, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাংলাদেশি (১২ বছরের নিচে) ২ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের দর্শক ৫ টাকা, অন্যান্য বিদেশি দর্শক ৭৫ টাকা জনপ্রতি।
প্রতিবন্ধি দর্শকরা বিনামূল্যে জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারেন এছাড়া আগে থেকে আবেদন করলে ছাত্র-ছাত্রীদেরও বিনামূল্যে জাদুঘরটি দেখতে দেয়া হয়।
আহসান মঞ্জিলের পূর্ব দিকের প্রবেশপথের ডান পাশে টিকেট কাউন্টার রয়েছে। কাউন্টার হিসেবে যেসব কক্ষ ব্যবহৃত হচ্ছে সেটি পূর্বে সৈনিকদের ব্যারাক ও গার্ডরুম ছিল।

দর্শনীয় বস্তু
ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন আহসান মঞ্জিল। নবাব পরিবারের স্মৃতি বিজড়িত এই প্রাসাদটি বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।বর্তমানে আহসান মঞ্জিলের মূল প্রাসাদটি ২৩টি গ্যালারিতে রূপান্তর করা হয়েছে। ১৯০৪ সালে তোলা ফ্রিৎজকাপের আলোকচিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন কক্ষ ও গ্যালারিগুলো  সাজানো হয়েছে।

১নং গ্যালারি
উনিশ শতকের সৈনিকের বর্ম, ভবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, সংস্কারপূর্ব ও পরবর্তী আলোকচিত্র ও পেইন্টিং। আহসান মঞ্জিল নিলামে বিক্রির জন্য এবং নতুন ভবন তৈরির নির্দেশ নামা।

২নং গ্যালারি
নবাবদের ব্যবহৃত আলমারি, তৈজসপত্র, ফানুস ও ঝাড়বাতি।

৩নং গ্যালারি
প্রাসাদ ডাইনিং রুম, নবাবদের আনুষ্ঠানিক ভোজন কক্ষ্ এটি।

৪নং গ্যালারি
বক্ষস্ত্রান ও শিরস্ত্রান, হাতির মাথার কংকাল (গজদন্তসহ), অলংকৃত দরমা বেড়া/কাঠ ছিদ্র অলংকরন সম্বলিত।

৫নং গ্যালারি
প্রধান সিড়িঘর নিচতলা। দরজার অলংকৃত পাল্লা, ঢাল-তরবারি, বল্লম, বর্শাফলক।

৬নং গ্যালারি
স্যার আহসানুল্লাহ জুবিলী মেমোরিয়াল হাসপাতালে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক কিছু সরঞ্জামাদি ও খাতপত্র এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে।

৭নং গ্যালারি
মুসলিম লীগ কক্ষ। এ কক্ষটি নবাবদের দরবার হল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাকালে শাহবাগের সম্মেলনে আগত সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দর একটি বড় তৈলচিত্র এই গ্যালারিতে আছে।

৮নং গ্যালারি
বিলিয়ার্ড কক্ষ। ১৯০৪ সালে তোলা আলোকচিত্র অনুযায়ী বিলিয়ার্ড টেবিল, লাইটিং ফিটিংস, সোফা ইত্যাদি তৈরি করে সাজানো হয়েছে।

৯নং গ্যালারি
সিন্দুক কক্ষ- ঢাকার নবাবদের কোষাগার হিসেবে ব্যবহৃত কক্ষ। এতে আছে ৯৪ লকার বিশিষ্ট বৃহদাকার লোহার সিন্দুক। বড় কাঠের আলমারি ও মাঝারি ও ছোট কয়েকটি সিন্দুক। লোহার গ্রীল, দরজার পাল্লা ইত্যাদি।

১০নং গ্যালারি
নওয়াব পরিচিতি- এই গ্যালারিতে ঢাকার নওয়াব পরিবারের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের পরিচিতি ও বংশ তালিকা এবং নবাবদের কাশ্মীরবাসী আদিপুরুষ থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত বংশ তালিকা ও ইংরেজীতে লেখা আহসানউল্লাহর ডায়েরি ও উর্দূতে জমি পত্তন দেয়ার দলিল।

১১নং গ্যালারি
প্রতিকৃতি- এই গ্যালারিতে খ্যাতনামা, দেশবরেণ্য রাজনীতিবিদ, সমাজসেবী, ভূস্বামী, বুদ্ধিজীবী, সমাজসংস্কারক, কবি সাহিত্যিক ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের তৈলচিত্র ছবি রয়েছে।

১২নং গ্যালারি
নওয়াব সলিমুল্লাহ স্মরণে- নওয়াব সলিমুল্লাহর ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র, নবাবের ব্যবহার্য ব্যক্তিগত ও অফিসিয়াল জিনিস।

১৩নং গ্যালারি
প্রতিকৃতি- নবাব পরিবারের সদস্যগণদের অন্দর মহলে প্রবেশ করার জন্য রংমহল থেকে পশ্চিমাংশের একটি গ্যাংওয়ের মাধ্যমে যাতায়াত করতেন। বর্তমানে তা নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বন্ধ।

১৪নং গ্যালারি
হিন্দুস্তানি কক্ষ-১৯০৪ সালে ফ্রিৎজকাপের তোলা আলোকচিত্র অবলম্বনে এই গ্যালারি নির্মাণ ও সংস্কার কাজ চলছে।

১৫নং গ্যালারি
প্রধান সিড়িঘর দোতলা- সাদা সিমেন্টের ভাস্কর্য, আলোকচিত্র ও খোদাই করা কাঠের সিড়ি লাল গালিচার্য এবং ছাদে কাঠের অলংকৃত সিলিং।

১৬নং গ্যালারি
লাইব্রেরি কক্ষ- এই গ্যালারির সংস্কার কাজ চলছে।

১৭নং গ্যালারি
কার্ডরুম- ঢাকার নওয়াবদের তাশ খেলার কক্ষ। সংস্কার চলছে।

১৮নং গ্যালারি
নবাবদের অবদান ঢাকায় পানিয় জলের ব্যবস্থা। এ কক্ষটি গেষ্টরুম হিসেবে ব্যবহার হতো। এখানে পানির ড্রাম, আইসক্রীম, বালতি, কফি তৈরির মেশিন, কফির কাপ, কুলফি গ্লাস, পানির ট্যাপ, অলংকৃত বালতি রয়েছে।

১৯নং গ্যালারি
স্টেট বেডরুম-রাজকীয় অতিথীদের থাকা ও বিশ্রামের জন্য এই বেডরুম, শোবার খাট, আলমারী, ঘড়ি, ড্রেসিং টেবিল, আয়না, তাক, টেবিল-চেয়ার এখানে রয়েছে।

২০নং গ্যালারি
নওয়াবদের অবদান ঢাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। ঢাকায় বিদ্যুৎ, কেরোসিন বাতি, হারিকেন চুল্লি, হারিকেন সার্চ বাতি, দেশে বিদেশে জনকল্যাণ কাজে ঢাকার নওয়াবদের অর্থদানের বিবরণ, সিগন্যাল বাতি, বিভিন্ন দেশী বৈদ্যুতিক বাল্ব, কেরোসিন চালিত পাখা, বিভিন্ন প্রকার কাঁচের লাইট, মোমবাতি ষ্ট্যান্ড, ফানুস ইত্যাদি।কিভাবে যাওয়া যায়:ঢাকার গুলিস্থান থেকে সরাসরি বাস সার্ভিস চালু আছে। এছাড়া প্রাইভেট কার বা অটো সিনজি যোগেও যাওয়া যায়।

২১নং গ্যালারি
প্রাসাদ ড্রয়িং রুম।প্রাসাদ ড্রয়িং রুমটি ১৯০৪ সালে তোলা আলোকচিত্র অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। আহসান মঞ্জিলে আগত নওয়াবের বিশেষ অতথিবৃন্দকে এখানে অভ্যর্থনা জানানো হতো। দোতলায় এই কক্ষটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এর মেঝেটি কাঠের পাটাতনে তৈরী এবং ছাদে কাঠের তৈরী কারুকার্যম্য ভল্টেড সিলিং। সিলিং-এর সাথে লাগানো বৃহৎ বাটির ন্যায় কাটগ্লাসের ঝাড়বাতিগুলো নওয়াবদের সময়কার। তবে অন্যান্য আসবাবপত্র, ঝাড়বাতি ও লাইট ফিটিংসগুলো ছবির সাথে মিলিয়ে তৈরী করা হয়েছে। তৈজসপত্র ও ফুলদানীসহ এখানে প্রদর্শিত নিদর্শনের অধিকাংশই আহসান মঞ্জিল ও এডওয়ার্ড হাউজে প্রাপ্ত নওয়াবদের সময়কালের নিদর্শন।

আহসান মঞ্জিল। ছবি: ট্রাভেল টক

২২নং গ্যালারি
গোলঘর (দোতলা)।প্রাসাদের শীর্ষে দৃশ্যমান সুউচ্চ গম্বুজটি এই কক্ষের উপরেই নির্মিত। এ কক্ষটিকে কেন্দ্র করে পুরো রঙমহলকে দুটি সুষম অংশে বিভক্ত করা যায়। এখানে প্রদর্শিত অস্ত্রশস্ত্রগুলো আহসান মঞ্জিলে প্রাপ্ত। দোতলার এই কক্ষটির সম্মুখস্থ বারান্দা থেকেই প্রাসাদের দক্ষিণদিকের বৃহৎ খোলা সিঁড়িটি ধাপে ধাপে বুড়িগঙ্গার পাড়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য সংবলিত মনোরম ও বিস্তৃত অঙ্গনে গিয়ে মিশেছে।

২৩নং গ্যালারি
বলরুম (নাচঘর)।১৯০৪ সালে তোলা আলোকচিত্র অনুযায়ী মূলানুরূপে এ গ্যালারীটি সাজানো হয়েছে। উনিশ শতকে ঢাকা শহরে এত বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ নাচঘরের দৃষ্টান্ত আর ছিল না। ঢাকার নওয়াবগণ ছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় প্রকার সংস্কৃতির সমঝদার। নওয়াব আবদুল গনি নাচ, জ্ঞান ও কবিতা চর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তার পুত্র নওয়াব আহসানুল্লাহ নিজেই একজন উঁচুদরের সঙ্গীতজ্ঞ, বাদক ও কবি ছিলেন। নওয়াবদের মানসিকতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই কক্ষে একত্রে পাশাপাশি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় প্রকার নাচ-গানের একশটি কাল্পনিক দৃশ্য বৃহদাকার তৈলচিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। এখানে প্রদর্শিত সিংহাসন ও ক্রিস্টাল চেয়ার- টেবিলগুলো নওয়াবদের আমলের মূল নিদর্শন। তবে অন্যান্য আসবাবপত্র ও আয়নাগুলো ছবিতে দৃশ্যমান আসবাবপত্রের অনুকরণে তৈরী।

কীভাবে যাবেন

আহসান মঞ্জিল দেখতে গিয়ে ঢাকার একটি হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহি বাহনে ভ্রমণের স্বাদ নিতে পারেন। ঢাকার ফুলবাড়িয়া থেকে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে নামতে পারেন বাংলা বাজার মোড়, সেখান থেকে হাঁটা দূরত্বে আহসান মঞ্জিলের অবস্থান। ভাড়া, ২০-৩০ টাকা। তবে নিজস্ব বাহন নিয়ে গেলে শুক্রবার যাওয়াই ভাল। অন্য দিনগুলোতে পুরনো ঢাকার যানজট ছাড়াও পার্কিং এর জায়গার স্বল্পতা থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *