আমের মৌসুমে গৌড়ের পথে

কানসাট আম বাজার।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আমের চাষ চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলায়। আর সবচেয়ে বড় আমের হাটটিও বসে এ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায়। এছাড়া জায়গাটিতে আরো আছে ঐতিহাসিক প্রাচীন গৌড়ের নানান ঐতিহাসিক স্থাপনা। আমের মৌসুমে তাই ঘুওে আসতে পারেন চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে।

আম বাগান
চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহরে ছেড়ে মহানন্দা সেতু পার হলে মসৃণ পিচঢালা পথ চলে গেছে সোনা মসজিদ স্থল বন্দরে। এই সড়কেই দুই পাশে শুধুই আম বাগান। সব বাগানেই দেখা যাবে কৃষকদের ব্যস্ততা। বাগানগুলোতে আমে ভরপুর। আমের ভারে ডাল মাটি ছুঁই ছুঁই। পছন্দ মতো ডে কোন বাগানেই ঘুড়ে বেড়াতে পারেন।

কানসাট আম বাজার
চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহর থেকে থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে রয়েছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমের বাজার কানসাট। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বাজারে চলে আমের বিকিকিনি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হজার পাইকারী ক্রেতা এ বাজারে আসেন আম কিনতে। সাইকেল কিংবা রিকশা ভ্যানে বোঝাই করে আম নিয়ে গভীর রাত থেকেই এ বাজাওে জড়ো হতে থাকেন আম চাষীরা। আমের সময়ে সপ্তাহের প্রতিদিনই  এখানে হাট বসে।

ছোট সোনা মসজিদ।

ছোট সোনা মসজিদ
কানসাট অঅম বাজার থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার গেলে সড়কের পূর্ব পাশে দেখা যাবে সুলতানি স্থাপত্যের রতœ হিসেবে খ্যাত ছোটসোনা মসজিদ। কালোপাথরে নির্মিত এ মসজিদটির স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য খুবই আকর্ষণীয়। প্রধান প্রবেশপথের উপরে স্থাপিত একটি শিলালিপি অনুযায়ী জনৈক মজলিস মনসুর ওয়ালী মোহাম্মদ বিন আলী কর্তৃক  মসজিদটি নির্মিত হয়। শিলালিপি থেকে নির্মাণের তারিখ সম্বলিত অক্ষরগুলি মুছে যাওয়ায় মসজিদটি নির্মানের সঠিক তারিখ জানা যায়না। তবে এতে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ এর নাম থাকায় ধারণা করা হয় মসজিদটি তাঁর রাজত্বকালের (১৪৯৪-১৫১৯) কোন এক সময় নির্মিত।

মসজিদের পূর্বপাশের সমাধিক্ষেত্রের ভেতরে একটি পাথরের প্লাটফর্মের উপরে দুটি সমাধি আছে। এখানে কারা সমাহিত রয়েছেন তা সঠিক জানা যায় নি। তবে জনশ্রুতি আছে সমাধি দুটিতে মসজিদের নির্মাতা ওয়ালী মুহাম্মদ ও তার পিতা আলীর বলে মনে করেন।  মসজিদ প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরে দক্ষিণ পূর্ব কোনে দুটি আধুনিক সমাধি রয়েছে। যার একটিতে সমাহিত আছেন বীর শ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর।

তাহ্খানা কমপ্লেক্স
সোনা মসজিদের পশ্চিম পাশে বিশাল একটি দিঘির পাড়ে অবস্থিত পাশাপাশি তিনটি প্রাচীন স্থাপনা। এর সর্ব দক্ষিণেরটি হলো তাহখানা। ভবনটিতে বেশ কয়েকটি কক্ষ ছিল। ভবনটির লাগোয়া পূর্ব দিকে আছে দিঘি। দিঘির ভেতর থেকেই ভিত্তি গড়ে ভবনটির পূর্বাংশ তৈরি করা হয়েছিল। এর নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য জানা যায় না। তবে জনশ্রুতি আছে সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহশুজা ১৬৫৫ সালে ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন তার বসবাসের জন্য। আবার কারো কারো মতে শাহশুজা গৌড় অঞ্চলে বসবাসকারী তার পীর শাহ নিয়ামত উল্লাহর জন্য এ ভবন নির্মাণ করেন। তাহ্খানা লাগোয়া উত্তর পাশের তিন গম্বুজ বিশিষ্ট শাহ নিয়ামত উল্লাহ মসজিদ। মসজিদটির পূর্ব দিকে একটি খোলা আঙ্গিনার চার পাশে আছে অনুচ্চ দেয়াল। পূর্ব দেয়ালের মাঝামাঝি জায়গায় আছে তোরণসহ প্রবেশপথ। মসজিদটির পূর্ব দেয়াল তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে প্রবেশপথ আছে। মসজিদটি নির্মাতা কে ছিলেন সে সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য নেই। তবে জনশ্রুতি আছে সম্রাট শাহজাহান শাহ নিয়ামত উল্লাহকে বছরে পাঁচ হাজার টাকা আয়ের একটি সম্পত্তি দান করেন। তিনি ৩৩ বছর এ সম্পত্তি ভোগ দখল করেন এবং এর আয় থেকে তার খানকার ব্যয় নির্বাহ করে উদ্বৃত অংশ দিয়ে এ মসজিদ নির্মাণ করেন।

মসজিদের লাগোয়া উত্তর দিকের ভবনটি শাহ নিয়ামত উল্লাহর সমাধি। প্রায় তিন বিঘা জায়গা জুড়ে সমাধি এলাকার বেস্টনি। মাঝখানে মূল সৌধটির চারপাশে রয়েছে পাথরে বাঁধানো বেশ কিছু কবর। দিল্লীর করনৌল প্রদেশের অধিবাসী শাহ নিয়ামত উল্লাহ ছিলেন একজন সাধক পুরুষ। কথিত আছে ভ্রমণের প্রতি তার ছিল প্রবল ঝোঁক। ভ্রমণ করতে করতে একসময় তিনি এসে উপস্থিত হন গৌড় এলাকায়। শাহশুজা তখন বাংলার সুবাদার। শাহশুজা নিয়ামত উল্লাহর সাক্ষাতে মুগ্ধ হন। এরপর তিনি এ জায়গায় বসবাস শুরু করেন। ১৬৬৪ সালে এখানেই তিনি মারা যান। তবে তার কবরের উপরে সৌধটি কে নির্মাণ করেন সে সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য জানা যায় না।

তাহখানা।

দরসবাড়ি মাদ্রাসা ও মসজিদ
তাহখানা থেকে সামনে সোনামসজিদ স্থল বন্দরের আগে সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত প্রাচীন একটি মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ। চার পাশে প্রায় ৫৫ মিটার দৈর্ঘ্যের বর্গাকৃতির এ স্থাপনাটিতে চল্লিশটি কক্ষ ছিল। ৪১.৫ মিটার আঙ্গিনার চার পাশে ঘিরে ছিল ৩ মিটার দৈর্ঘ্যরে বর্গাকৃতির এ কক্ষগুলো। এখানে একটি ঢিবির কাছে চাষ করার সময় কৃষকরা কয়েকটি ইট নির্মিত প্রাচীর ও একটি শিলালিপির সন্ধান পান। শিলালিপি থেকে জানা যায় মাদ্রাসাটি সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ ১৫০৬ সালে নির্মাণ করেছিলেন।দরস অর্থ শিক্ষা আর দরসবাড়ি অর্থ শিক্ষা কেন্দ্র। আর দরস বাড়িই কালক্রমে দারাসবাড়ি নামে রূপান্তরিত হয়েছে।

দরসবাড়ি মাদ্রাসা থেকে সামান্য পশ্চিমে বড় একটি পুকুরের ওপারে অবস্থিত দরসবাড়ি মসজিদ। কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত  এ মসজিদের শিলালিপি থেকে জানা যায় ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে শামসুদ্দীন আবুল মুজাফফর ইউসুফ শাহ কর্তৃক নির্মিত হয় মসজিদটি। মসজিদটির ছাদ বহু আগে ভেঙ্গে পড়েছে। আর সামনে ভেঙ্গে পড়া বারান্দার ধ্বংসাবশেষ আছে। বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট সম্বলিত এ মসজিদের বাইরে ও ভেতরে লাল ইটের এবং পাথরের টেরাকোটা স্থান পেয়েছে। মসজিদের দুটি অংশ, একটি সামনের বারান্দা এবং পশ্চিমে মূল প্রার্থনা কক্ষ। ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের স্তম্ভগুলি। কারুকার্য খচিত মসজিদের পশ্চিম দেয়ালের মিহরাবগুলি এখনো টিকে আছে কালের শাক্ষী হয়ে।

কোতোয়ালী দরওয়াজা
ভারত- বাংলাদেশের সিমান্তে ছোট সোনা মসজিদ স্থল বন্দর থেকে ভারতের প্রবেশ পথটিই কোতওয়াল দরজা। নগর পুলিশের ফারসি প্রতিশব্দ কোতওয়াল এর অনুকরণে এর নামকরণ। এ নগর পুলিশ প্রাচীন গৌর নগরীর দক্ষিণ অংশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত ছিল বলে জানা যায়। প্রবেশ পথের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের দেয়ালে ছিদ্র আছে। এগুলি দিয়ে শত্রুর ওপরে গুলি কিংবা তীর ছোড়া হতো বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। কোতোয়ালী দরওয়াজাটি সাধারণভাবে কাছে গিয়ে দেখার উপায় নেই। সোনা মসজিদ স্থল বন্দরে দাঁড়িয়ে কেবল দূর থেকে দেখা সম্ভব। কারণ এটি ভারতের অংশে পড়েছে।

খনিয়াদিঘি মসজিদ
সোনামসজিদ স্থল বন্দর থেকে পূর্ব দিকের সড়ক ধরে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে সড়কের বাম পাশে  আম বাগানের ভেতরে খনিয়া দিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত মসজিদটি। ইটের তৈরি এ মসজিদটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট। বারান্দা থেকে মূল প্রার্থনা কক্ষে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি দরজা। পশ্চিম দেয়ালে আছে তিনটি মিহরাব। মাঝের মূল মিহরাবটি অন্য দুটি অপেক্ষা বড়। পুরো মসজিদটি এক সময় টেরাকোটা আচ্ছাদিত ছিল। যার অনেকগুলো এখনো বিদ্যমান।

খনিয়াদিঘি মসজিদের নির্মাণকাল সম্পর্কে স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থাপত্যিক রীতির বিচারে ঐতিহাসিকগণ এটিকে পরবর্তী ইলিয়াস ইলিয়ামশাহী আমলে ১৪৮০ সালের দিকে নির্মিত বলে মনে করেন।  মসজিদের পূর্ব দিকেই রয়েছে রয়েছে প্রাচীন আমলের খনিয়াদিঘি। এ কারণেই এর এরূপ নামকরণ। তবে এ মসজিদের অন্য একটি নাম হলো রাজবিবি মসজিদ।

ধুনিচক মসজিদ
খনিয়াদিঘি মসজিদের প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত একটি মসজিদ। ইটের তৈরিএ মসজিদটি আয়তকার। মসজিদটির নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য নেই। তবে নির্মাণ শৈলী বিবেচনায় এ মসজিদটিও পনের শতকের শেষের দিকে ইলিয়াস শাহী আমলে নির্মিত।

 

কীভাবে যাবেন
সড়কপথে

ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে যেতে পারেন কানসাট। এছাড়া বাসে চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলাশহরে এসেও সেখান থেকে যায়গাগুলোতে আসা যায়। ঢাকার গাবতলী থেকে সরাসরি চাঁপাইনবাবগঞ্জ চাঁপাই নবাবগঞ্জ যায় দেশ ট্রাভেলস এর এসিবাস। ভাড়া ১২০০ টাকা। এছাড়া দেশ ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহনের নন এসি বাস যায় সরসরি কানসাট বাজার, ভাড়া ৫৫০-৬০০ টাকা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কানসাট, সোনামসজিদ স্থল বন্দরে যাবার জন্য লোকাল ও বিরতিহীন বাস সার্ভিস আছে। ভাড়া ৪৫-৬৫ টাকা।

রেলপথে
ঢাকা থেকে রেলযোগে সরাসরি রাজশাহী এসে সেখান থেকেও আসতে পারেন চাঁপাই নবাবগঞ্জ। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে রোববার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় আন্ত:নগর ট্রেন ৭৫৩ সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, শনিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৬টায় ছেড়ে যায় আন্ত:নগর ট্রেন ৭৬৯ ধূমকেতু এক্সপ্রেস এবং মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১১টা ১০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্ত:নগর ট্রেন ৭৫৯ পদ্মা এক্সপ্রেস।

রাজশাহী থেকে সপ্তাহের রোববার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় আন্ত:নগর ট্রেন ৭৫৪ সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১১টা ২০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্ত:নগর ট্রেন ৭৭০ ধূমকেতু এক্সপ্রেস এবং মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৪টায় ছেড়ে যায় আন্ত:নগর ট্রেন ৭৬০ পদ্মা এক্সপ্রেস।

ভাড়া শোভন চেয়ার ৩৪০ টাকা, স্নিগ্ধা ৫৭০, এসি সিট ৬৮০  এবং ১০২০ টাকা।

এছাড়া ঢাকার কমলাপুর থেকে শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় আন্ত:নগর ট্রেন ৭৯১ বনলতা এক্সপ্রেস এবং রাজশাহী থেকে ট্রেনটি শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৭টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। ভাড়া শোভন চেয়ার ৫২৫ টাকা এবং স্নিগ্ধা ৮৭৫ টাকা।

এছাড়া ঢাকা থেকে আকাশপথে রাজশাহী এসে সেখান থেকেও যেতে পারেন চাঁপাই নবাবগঞ্জ। ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমান, নভো এয়ার ও ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান চলাচল করে রাজশাহীর পথে। সর্বনিম্ন ভাড়া ২৯০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন
কানসাটে পর্যটকদের থাকার ভালো কোন ব্যবস্থা সেই। সারাদিন ঘুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরে এসে রাত যাপন করতে হবে। এ শহরে সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে। শহরের শান্তির মোড়ে হোটেল আল নাহিদ, আরামবাগে হোটেল স্বপ্নপুরী, লাখেরাজপাড়ায় হোটেল রাজ, একই এলাকায় হোটেল রংধনু, এসব হোটেলে ২০০-২০০০ টাকায় কক্ষ ভাড়া পাওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *