অভিযাত্রীর বোয়ালিয়া অভিযান

ছবি: আহসান হাবিব মুরাদ

ইমাম হোসেন

অনেক দিন পাহাড়ে ট্রেকিং করিনি। ফিজিক্যাল কন্ডিশনও খুব একটা ভালো না। পাহাড়ে যাওয়া জরুরি হয়ে উঠেছিল। ঠিক সে সময় অভিযাত্রীর সিদ্ধান্ত বোয়ালিয়া ট্রেইলে ট্রেকিং হবে। ঠিক হলো ১৭ অক্টোবর রাতে যেয়ে ১৮ অক্টোবর ট্রেকিং শেষ করে রাতের গাড়িতে ঢাকা ফেরা।

ফকিরাপুল থেকে রাতে ১১.৩০ মিনিটে গাড়ি। ১১.০০ বাজতে বাজতেই সবাই ফকিরাপুল এসে উপস্থিত। এই ট্রেকিং এর মূল দায়িত্বে মামুন ভাইয়া, আর আমি আছি সহযোগী হিসেবে। আমাদের হিসেব মতে ১৫ জন যাবে, সেই হিসেবেই বাসের টিকেট করা। ১৪ জন চলে এসেছে, কিন্তু আর একজন কে? পরে হিসেব করে দেখি আমরা এক নাম ডাবল লিখেছি। এই নিয়ে হাসতে হাসতে বাসে চেপে বসলাম।

বাস যখন ঢাকা চিটাগং হাইওয়েতে ছুটে চলছে তখন বুঝতে পারলাম এই বঙ্গদেশে শরৎ শেষ হয়েছে। ইট পাথরের এই শহরে কখন শরৎ আসে কখন হেমন্ত আসে তা বুঝবার উপায় নেই একদম। বেশ ঠাণ্ডা বাতাস, দুই চোখে একদম ঘুম নেই, দূরে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা আলোগুলো দূরে আরো দূরে চলে যাচ্ছে। আমাদের প্রতিনিয়ত ছুটে চলা জীবনটাও মনে হয় এমন।

ছবি: আহসান হাবিব মুরাদ

মাত্র একটু চোখ লেগে আসছে, দূরে সুমধুর কণ্ঠে ভেসে আসছে “আস’সালাতু খাইরুম মিনাননাউম” এর মধ্যে আমাদের গাড়ি এসে থামলো মিরেরসরাই। এখান থেকে সিএনজি নিয়ে ব্রাক পোলট্রি ফার্ম যেতে হবে। জনপ্রতি ভাড়া ২০টাকা, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এই রাস্তাটুকু হেঁটে চলে যাবো। মাত্র ফজরের আজান হয়েছে। শীতের ঠাণ্ডা আবেশ, আকাশ ভরা তারা, আমরা ১৪ জন হেঁটে যাচ্ছি। আমাদের কতো কতো গল্প সেখানে!

আমরা ব্রাক পোলট্রি ফার্মে এসে পৌঁছালাম। এখানে কয়েকটা খাবার দোকান আছে৷ কিন্তু এখনো খোলেনি, সোহাগ ভাইয়ার পূর্ব পরিচিত দোকানদারকে কল করা হলো। আমরা ততক্ষণে গল্পে মেতে উঠলাম। সকালের নাস্তা হলো রুটি ডালভাজি। এখান থেকেই মূলত ট্রেকিং শুরু। একজন গাইডও নিতে হবে এখান থেকে।

ট্রেকিং-এ গেলে অবশ্যই কিছু জিনিস ফলো করতে হয়। যেমন আপনি যে পোশাক পরে ট্রেকিং করবেন সেটা আরামদায়ক হওয়া উচিত, যে রাস্তায় ট্রেকিং করবো সে রাস্তার উপযোগী জুতা, পানি, শুকনো খাবার নেওয়া যেটা দ্রুত শরীরে এনার্জি দেবে, রোদ চশমা, গামছা বা টাওয়েল, ধারালো কোনো বস্তু।
সব প্রস্তুতি শেষ, আমরা ৭.০৬ মিনিট যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমে গাইড, সোহাগ ভাইয়া, পিছনে আমি, শিল্পী আপু, হাফিজ ভাই। পাহাড়ে প্রবেশ করতেই টের পেলাম এখানে ট্রেকিং এর পথ খুব বেশি সুখকর হবে না। কাদা আর ছোট্ট একটা ঝিরিপথ পার হয়ে পাহাড়ে ঢুকলাম। আমাদের দেশের পাহাড়ের এই রেঞ্জটাতে এমন অসংখ্য ট্রেইল রয়েছে। শতশত বছর ধরে পাহাড়ের যে কোনো প্রান্তে বৃষ্টি হলেই এই সব পাথুরে রাস্তা দিয়ে পানি নেমে আসে সমতলে। আমরা মূলত এই পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাবো।

ছবি: আহসান হাবিব মুরাদ

সমতল শেষে যখন প্রথম ঝিরিপথে নামলাম তখন উঁচু পাহাড়ের গাছপালার ফাক গলে দিনের প্রথম সূর্যের আলো আমাদের স্পর্শ করছে। ঝিরিপথে দুই কদম হেঁটেই বুঝলাম এই ট্রেকিং খুব বেশি আনন্দের নয়, তবে যতো কষ্ট ততই নাকি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। প্রকৃতির কাছে এসে প্রকৃতির কাছেই নিজেকে সমর্পণ করতে হয়, প্রকৃতি আপনাকে ভালো রাখবে।

ঝিরিপথ দিয়ে সামনে এগোচ্ছি, পায়ের নিচে পাথর আর কাদার মিশ্রণ, সামনে যতই এগোচ্ছি বন ততই ঘন হচ্ছে। আপনি যদি একটু প্রকৃতিপ্রেমী হয়ে থাকেন আর একটু কৌতুহল থাকে মনে মধ্যে তবে অবশ্যই আশেপাশে পর্যবেক্ষণ করবেন। দেখবেন কতো বিস্ময় আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

ঝিরিপথ পার হয়ে আমরা এসে উঠলাম এই মস্ত পাথুরে রাস্তায়। আমার কাছে এটাকে নদী মনে হলো। দুইপাশে উঁচু গাছ নিচে পুরোটা পাথর। ভরা বর্ষায় এটা কতটা সৌন্দর্য বহন করে সেটা ভেবেই অবাক হচ্ছি। এখানকার পাথরগুলো ভয়ানক পিচ্ছিল। এর মধ্যেই আমাদের কয়েকজন বাজে ভাবে পড়েছে। এখানে একটা স্বস্তির বিষয় হচ্ছে মানুষের তেমন একটা ভিড় নেই জায়গাটিতে।

আমরা যতো উপরে যাচ্ছি ততই যেনো মুগ্ধ হচ্ছি। আমি, শিল্পী আপু সবার পিছনে, কিছু কিছু সময় সবাই অনেক আগে চলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে রাগও হচ্ছে। আরে বাবা আমরা তো কোনো প্রতিযোগিতায় আসিনি। এখনকার পাথুরে গঠন দেখে খুব অবাক হচ্ছি। এমন গঠন আগে কখনো দেখিনি আমি। মানুষের পদচারনা বেশ কম থাকায় শত বছরের জমে থাকা শ্যাওলা আমাদের মধ্যে একটা ভীতির কাজ করছে।

বেশ উঁচু বড় একটা জায়গাতে এসে বসলাম। এখানে কলা খেয়ে পানি খেয়ে, নওশীন আপুর বিখ্যাত চা খেয়ে আবার যাত্রা শুরু। রাস্তা যেখানে শেষ সেখানেই একটা ঝর্ণা। আমাদের গাইডের মতে উপরে তেমন কিছুই নেই। কিন্তু আমাদের কয়েকজন উপরে উঠে আমাদেরকেও আসতে বললো, শেষে আমি মামুন ভাই, তনা আপু উপরে উঠলাম। পাথরের খাজে পা দিয়ে উপরে উঠতে হবে। একবার পিছলে নিচে পড়লেই শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিক থাকবে বলে মনে হয় না। একটু সামনে এগিয়ে রীতিমত ভয় পেলাম। এখন এই ভয়কে জয় করার পালা। হাতের লাঠি দিয়ে পানি পরিমাপের চেষ্টা করলাম।

ছবি: আহসান হাবিব মুরাদ

নাহ্ ঠাই পেলাম না। সামনে তাহজীব আর শিল্পী আপু রীতিমত যুদ্ধ করছে। পাথুরে পাহাড়ের গা ঘেসে খাজে খাজে পা দিয়ে পার হতে হবে। তাদের দুইজনের কাছে এগিয়ে গিয়ে শিল্পী আপুকে পার করলাম। তার আগেই কোমর পানি পার করে আসছি। তখনই তাহজীবের মোবাইল ভিজে গেছে সেটা দেখতে গিয়ে বেচারি পড়লো পানির নিচে একটা পাথরের খাজের মধ্যে। কোনো রকমে টেনে তুললাম। বলতেই হয় ভাগ্য সহায় ছিলো এযাত্রা। এখান থেকে উঠে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। ভেতর থেকে কান্না পাচ্ছে, দুইপাশে উঁচু পাহাড়, গাছ, আর আমরা দাঁড়িয়ে আছি নদীর মতো জায়গাতে। পুরোটা পাথুরে, আলো আঁধারী খেলার মধ্যে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। ভরা বর্ষায় মনে হয়না এখনে আসা যায়। তবে যদি কেউ আসে তবে অবশ্যই সে ভাগ্যবান।

আবার নিচের দিকে ফিরে আসছি, মনের মধ্যে কেমন একটা হাহাকার করছে। এমন একটা জায়গায় কপালে না থাকলে আসা যায়না। নিজেকে অবশ্যই ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছিল।

একটু নিচে নেমে আবার বামে আর একটা ঝিরিপথ চলে গেছে, এবার সেদিকে পা বাড়ালাম। বাহির থেকে বোঝা যায়নি ভেতরটা এমন দারুণ। ঝিরিপথের মুখে জঙ্গলে ঘেরা, ভিতরটা অসম্ভব সুন্দর। ছোট বড় পাথর পাড়ি দিয়ে একটা ঝরনা, পাশে শেকড় ধরে উপরে উঠে এক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। পুরো একটা গুহার মতো জায়গা, সেখানে অনেক উঁচু থেকে পানি পড়ছে। পাহাড়ের গা বেয়ে কতো বিচিত্র উদ্ভিদ।

সেখান থেকে বেড়িয়ে এবার ফেরার পালা। কিন্তু সব কিছু কেমন অপরিচিত লাগছে। আমরা যখন ভিতরে আসি তখন সেভাবে সূর্যের আলো আসেনি। এর মধ্যে আমাদের ট্রেকিং ছয় ঘণ্টা পার করেছে। চারদিকে আলো, দুই পাশে উঁচু পাহাড়, গাছ নিচে পানি পাথর আর উপরে সাদা মেঘের ভেলা, এক জীবনে এই রূপ দেখে আর কি লাগে। আবারও বলতে ইচ্ছা করছে জীবন সুন্দর, অসম্ভব সুন্দর…

ছবি: আহসান হাবিব মুরাদ

এবার আমরা যাচ্ছি বোয়ালিয়া ঝরনা দেখতে। আমি আর শিল্পী আপু সবার পিছনে। একটা জায়গা এসে দুইজন দুইজনের দিকে তাকিয়েই হেসে দিলাম। এখানে তিনটা রাস্তা তিনদিকে চলে গেছে। একটু বোঝার চেষ্টা করলাম পানি যেদিকে ঘোলা আমরা সেদিকে আগাব, মজার ব্যাপার হচ্ছে পানি সব দিকেই ঘোলা। এমন পরিস্থিতি আসলেই বিব্রতকর। যদিও আমরা লোকালয়ের খুব কাছাকাছি সেদিক দিয়ে আমাদের বেশ সাহস আছে মনের মধ্যে। কিন্তু এমন পরিস্থিতি গহীন বনে হলে অবশ্যই বড় প্রব্লেম। তাই দলছুট হওয়া একদম উচিৎ নয়।

কিছু মানুষের চিল্লানো শুনে আপুকে রেখে আমি একটু সামনে এগিয়ে দেখি তারা এগিয়ে আসছে। বুঝলাম সবাই এদিকে গেছে। আমরা পা বাড়ালাম সেদিকে। বেশ বড়সড় ঝরনা, আমি উঁচু জায়গা দেখে বসলাম, সবাই নামল নিচে। আমার গলায় দুইটা ক্যামেরা। সেই হিসেবে নিচের থেকে সবাই চিৎকার করছে ছবি তোলার জন্য৷ কিন্তু এখান থেকে একদম ছবি ভালো আসছে না। তাও সবার মন রক্ষা করলাম।

পাহাড় থেকে যখন বেড়িয়ে এলাম তখন মনের মধ্যে কেমন একটা শূণ্যতা এসে ভর করছে। আরো কিছুটা সময় যদি প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা যেত। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা পরে আমরা ফিরে এলাম। অনেক দিন পরে ট্রেকিং, স্বাভাবিক একটা ক্লান্তি এসে ভর করছে তাই।

দুপুরে দারুণ একটা লাঞ্চ সেরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সন্ধ্যার গাড়িতে ঢাকা ব্যাক করবো। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেটা মিরেরসরাই ফটিকছড়ি রোড। পুরো পাহাড়ের মাঝ দিয়ে এই রাস্তা চলে গেছে।

ছবি: আহসান হাবিব মুরাদ

এই রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগুলে নাকি একটা চায়ের দোকান আছে। আমরা ঠিক করলাম সেখানে গিয়ে চা খাবো। পা বাড়ালাম সেদিকে, পাহাড়ি পিচঢালা পথ শুধু উপরে উঠছে। পাঁচ সাত মিনিট হাঁটার পরেই জনশূন্য হয়ে গেলো। শুধু আমরা কয়েকজন হেঁটে যাচ্ছি। পাহাড়ের উপরে উঠছি তো উঠছি, কোনো মানুষ নেই, মাঝে মধ্যে একটা দুইটা অটো রিকশা যাওয়া আসা করছে। যতই উপরে উঠছি ততই চারপাশে দৃশ্য বাড়ছে। সব কিছু ছেড়ে আমরা উপরে উঠছি। কিন্তু চায়ের দোকান আর কতদূর? তার উত্তর একটাই, এই তো সামনে!

এক ঘণ্টা ধরে শুধু উপরেই উঠছি কিন্তু ‘এইতো সামনেই’ আর আসে না। আমি, নওশীন, মুরাদ ভাই, বিপ্লব, লিংকন ভাই, মহুয়া আর গাইড মামা ছাড়া পিছনে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। মাঝে পাহাড়ের উপরে থেকে পানির মতো কিছু একটা দেখলাম, ভাবলাম চোখের ভুল। ফিরতি পথে অবশ্য আবীর ম্যাপ বের করে দেখলো ওটা বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ প্রণালী, যেখানে ফেনী নদী এসে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।

প্রায় চার কিলোমিটার পর একদম আপ হিলে একটা চায়ের দোকান পেলাম অবশেষে। চা আর বেলা বিস্কুট খেয়ে বসে আছি, ভাবলাম সবাই ফিরে গেছে। না কিছু সময় পরে দেখি সবাই হাপাতে হাপাতে আসছে।

ফিরতি পথটা ছিলো খুব মজার, শুধু ডাউন হিল। আমরা নামছি আর নামছি। হুটহাট করে চলে আসা অটো রিকশার যাত্রীরা অবাক হয়ে আমাদের দেখছে। কি জানি মনে মনে কিযে ভাবছে। আমরা ৫০ মিনিটেই ফিরলাম এবার। পোল্ট্রি ফার্ম থেকে অটো রিকশা নিয়ে মিরেরসরাই বাজার। সেখানে বুকিং টিকেট কনফার্ম করলাম। বাস আসলো ১০ মিনিট লেটে। বাসে উঠেই সিটে শরীর এলিয়ে দিলাম।

জানিনা আর কখন ওপথে হাটা হবে কিনা, তবে আবার যেতে চাই ওখানে, আবার ওপথেই নতুন কিছু দেখতে চাই। সুস্থভাবে ফিরে এসে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে নিজেকে। অভিযাত্রীকে ধন্যবাদ.. ধন্যবাদ, দারুণ ১৪ জন অভিযাত্রীকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *